দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
ভারতের গুজরাটের সুরেন্দ্রনগর জেলায় ‘পবিত্রকরণ আচার’ পালনের অজুহাতে এক নারীকে আটকে রেখে নির্যাতন ও দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে। পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পর বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। এ ঘটনায় ওই নারীর স্বামীসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন নারীও রয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এক নারীকে আটকে রেখে শারীরিকভাবে নির্যাতন ও অপমান করতে দেখা যায়। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি তাকে ঘিরে উপহাস করছেন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ ঘটনাটি তদন্তে নামে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ভুক্তভোগী নারী শুরুতে থানায় অভিযোগ করতে আসেননি। স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ নিজ উদ্যোগে তদন্ত শুরু করে।
সুরেন্দ্রনগরের পুলিশ সুপার প্রেমসুখ দেলুর বক্তব্য অনুযায়ী, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সূত্র ধরে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে ওই নারীকে খুঁজে বের করে। পরে তার আনুষ্ঠানিক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয় এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারী তার স্বামীকে ছেড়ে অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে বসবাস করছিলেন। এ কারণে তার স্বামী ও কয়েকজন আত্মীয় তাকে একটি ঘরে আটকে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নারীকে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখা হয় এবং শিকল দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে অভিযুক্তরা তার পিছু ধাওয়া করে তাকে ধরে ফেলেন। পরে দড়ি দিয়ে তাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।
পুলিশের অভিযোগ, ওই নারীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে অভিযুক্তরা ‘শুদ্ধিকরণ’ বা ‘পবিত্রকরণ’ আচার পালনের কথা বলে তার ওপর নির্যাতন চালান।
নির্যাতনের সময় নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং তার সঙ্গে বসবাসকারী ব্যক্তিকেও মারধর করা হয়। ওই নারী ও পুরুষের ওপর চালানো নির্যাতনের পুরো ঘটনা ক্যামেরায় ধারণ করা হয়।
পরে অন্যদের জন্য ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিডিওটি ইনস্টাগ্রামসহ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা হয়েছিল।
তবে যৌন নির্যাতনের ওই ভিডিও পুনরায় প্রচার না করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ধরনের ভিডিও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও মর্যাদা আরও ক্ষুণ্ন করে এবং আইনগত অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন নারী রয়েছেন। পুলিশের দাবি, ওই দুই নারী অপরাধে সহায়তা ও প্ররোচনা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভারতের ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণ, গুরুতর আঘাত করা, বেআইনিভাবে আটক রাখা এবং সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া যৌনভাবে স্পষ্ট ছবি বা ভিডিও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশের অভিযোগে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ধারাও যুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের সবাই সুরেন্দ্রনগরের দুদরেজ গ্রামের বাসিন্দা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ভুক্তভোগীর স্বামীও রয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের অতীত অপরাধের ইতিহাস এবং ঘটনার সঙ্গে প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভিডিওতে যাদের উপস্থিতি দেখা গেছে, তাদের পরিচয় এবং অপরাধে সংশ্লিষ্টতা তদন্ত করে যাচাই করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীকে চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে পুলিশ তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে।
আইনজীবী ও নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় রীতির নামে কাউকে আটকে রাখা, শারীরিকভাবে নির্যাতন করা, যৌন নিপীড়ন চালানো কিংবা ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া—কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো সরাসরি গুরুতর অপরাধ। সামাজিক বা পারিবারিক বিরোধের সমাধান হিসেবে জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।
সুরেন্দ্রনগরের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, কুসংস্কার, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও তথাকথিত ‘সম্মান রক্ষার’ নামে নারীর ওপর সহিংসতা কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পুলিশের তদন্ত শেষ হলে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ আরও স্পষ্ট হবে।
