দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
গ্যাস সংকটে প্রায় আট মাস বন্ধ থাকার পর উৎপাদনে ফেরার দুই দিনের মাথায় আবারও বন্ধ হয়ে গেছে জামালপুরের সরিষাবাড়ীর যমুনা সার কারখানা। বুধবার বিকেলে কারখানার বয়লারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ইউরিয়া সার উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বয়লারের ত্রুটি দ্রুত মেরামত করা গেলে শুক্রবারের মধ্যে উৎপাদন ফের শুরু হতে পারে।
কারখানার উৎপাদন বিভাগের প্রধান ফজলুল হক জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ পাওয়ায় সোমবার গভীর রাতে উৎপাদন শুরু হয়েছিল। দুই দিনে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টন সার উৎপাদনের পর বয়লারে ত্রুটি দেখা দেয়। কারখানার অন্য যন্ত্রপাতি সচল রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
যমুনা সার কারখানাটি স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৭০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য নকশা করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের গ্যাসের চাপের ঘাটতি ও বিভিন্ন যান্ত্রিক সমস্যার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এর কার্যকর উৎপাদন সক্ষমতা কমে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টনে নেমেছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫ লাখ ৬১ হাজার টন।
গ্যাস সংকট কারখানাটির উৎপাদন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বড় বাধা হয়ে আছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৩ মাস কারখানাটি বন্ধ ছিল। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবার গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ২০ সেপ্টেম্বর গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু হলেও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদনে ফেরা সম্ভব হয়নি। পর্যাপ্ত চাপ পাওয়ার পর গত সোমবার রাতে উৎপাদন শুরু হয়েছিল।

কারখানাটি উৎপাদন চালু রাখতে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন হয়। এর আগে কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, নিরবচ্ছিন্ন ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য প্রায় ৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও ৪২ থেকে ৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহেও সীমিতভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব। গ্যাস সরবরাহের চাপ কম থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
দেশের সার উৎপাদন ব্যবস্থায় গ্যাস সংকটের প্রভাব সামগ্রিকভাবেও দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন জানিয়েছিল, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কয়েকটি সার কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে গেলে কৃষি মৌসুমে ইউরিয়া আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
যমুনা সার কারখানা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কারখানাটির উৎপাদিত সার জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইলসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। ফলে উৎপাদন বারবার বন্ধ হওয়ায় শুধু কারখানার আর্থিক কার্যক্রম নয়, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সার সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ থাকলে মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সার উৎপাদন করা সম্ভব। উৎপাদন থেকে মাসে প্রায় ৬০ কোটি টাকা মুনাফা হওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানার যন্ত্রপাতি সচল রাখতে প্রতি মাসে প্রায় ৬ কোটি টাকা গ্যাস বিল দিতে হয়।
গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটি দ্রুত মেরামত করে কারখানাটিকে স্থিতিশীল উৎপাদনে ফেরানো এখন কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর অল্প সময়ের মধ্যে আবার উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় রাষ্ট্রীয় এই সার কারখানার নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
