দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । মোঃ আখতার হোসেন রুমি ।
অক্টোবরের হিমেল বাতাসটা যেন প্রতি বছরই এক অদ্ভুত ভারী অনুভূতি বয়ে নিয়ে আসে। আজ ৭ই অক্টোবর, ২০২৬ সাল। ক্যালেন্ডারের পাতার এই বিশেষ দিনটি মনে করিয়ে দেয় এক তরুণের আত্মত্যাগের কথা, যার রক্তের দাগ লেগে আছে এ দেশের সার্বভৌমত্বের ইতিহাসের পাতায়। দেখতে দেখতে সাতটি বছর পেরিয়ে গেল। বুয়েটের সেই ছোট্ট রুমটিতে যে প্রদীপটি নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তা আজ একটি জাতির বিবেক জাগ্রত করার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে।
বুয়েটের শেরে বাংলা হলের করিডোরে আজ আর সেই ভয়ার্ত নীরবতা নেই, কিন্তু বাতাসে এখনও যেন ভেসে বেড়ায় এক করুণ স্মৃতি। ঠিক সাত বছর আগে, ২০১৯ সালের এই দিনে, একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে নৃশংসভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের প্রাণ। কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না তার, ছিল কেবল দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে এক নিঃশঙ্ক দেশপ্রেমিকের স্পষ্ট উচ্চারণ। তিস্তা আর ফেনী নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন মনোভাবই ছিল তার একমাত্র ‘অপরাধ’।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর রায়ডাঙ্গা গ্রামে আবরারের পৈতৃক বাড়ির চিত্রটা আজও থমথমে। মা রোকেয়া খাতুনের চোখ দুটো হয়তো চোখের জল ফেলতে ফেলতে শুকিয়ে গেছে, কিন্তু ছেলের স্মৃতিগুলো এক মুহূর্তের জন্যও ধূসর হয়নি। ঘরের এক কোণে সাজিয়ে রাখা আবরারের পড়ার টেবিল, চশমা আর প্রিয় বইগুলোর দিকে তাকালে আজও যেন সেই শান্ত, ভদ্র আর চিন্তাশীল ছেলেটির উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
মায়ের বুক খালি হয়ে গেলেও আজ পুরো দেশের তরুণ সমাজের বুকে আবরার এক চিরন্তন সাহসের নাম। তিনি ছিলেন এ দেশের আগ্রাসনবিরোধী চেতনার সর্বপ্রথম বেসামরিক শহীদ, যিনি কোনো দলীয় পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে নয়, বরং খাঁটি দেশপ্রেমের তাগিদে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তাঁর আত্মত্যাগ প্রমাণ করেছে, দেশের মাটি ও মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে কোনো বড় পদের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন কেবল একটি সাহসী ও সৎ হৃদয়ের।
আজকের এই দিনে সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা স্মরণ করছে তাদের এই অগ্রজকে। যে বুয়েট ক্যাম্পাসে একসময় ভয়ের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, সেখানে আজ মুক্ত চিন্তার বাতাস। আবরারের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের সময় চোখে পড়ে বর্তমান প্রজন্মের দৃপ্ত চোখের চাহনি। আবরার নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া চেতনা প্রতিটি দেশপ্রেমিক তরুণের রক্তে মিশে গেছে।
একটি দেশ তখনই শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যখন তার তরুণরা দলীয় আনুগত্যের চেয়ে দেশের সার্বভৌমত্বকে বড় করে দেখতে শেখে। আবরার ফাহাদ সেই আদর্শের এক মূর্ত প্রতীক। তিনি শিখিয়ে গেছেন, দেশের স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস হতে পারে না। ক্ষমতা বা অপশক্তির ভয়কে তুচ্ছ করে সত্য উচ্চারণ করার নামই আসল দেশপ্রেম।
আজ তাঁর সপ্তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে গোটা জাতি গভীর শ্রদ্ধায় নত। প্রার্থনার হাতগুলো পরম করুণাময়ের দরবারে একটাই আর্জি জানায়—হে আল্লাহ, তুমি এই শহীদ তরুণকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করো এবং তাঁর পরিবারকে দাও ধৈর্য ও শক্তি।
একই সাথে প্রার্থনা থাকে, এ দেশের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে যেন আবরারের মতো নির্ভীক সন্তানের জন্ম হয়। যারা কোনো ভয়ের কাছে মাথা নত করবে না, সব দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল লাল সবুজের পতাকার মান রক্ষায় নিজের কণ্ঠস্বরকে গর্জে তুলবে। আবরার ফাহাদ কোনো সাধারণ নাম নন, তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের আত্মমর্যাদার এক অবিনাশী প্রতীক।
