দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একটি মামলায় জরিমানার আদেশ নিয়ে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে কথোপকথনের একপর্যায়ে এজলাস ত্যাগ করেছেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ।
মঙ্গলবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। এরপর ওই দিন আর আপিল বিভাগের কার্যক্রম বসেনি বলে আদালতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি। সমিতির সরকারি ওয়েবসাইটেও ২০২৬-২৭ মেয়াদে তাকে সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত একটি মামলায় পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা নিয়ে। একই বিষয়ে একাধিক রিট করা এবং আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগে রিট আবেদনকারী মো. নূর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন আপিল বিভাগ। জরিমানার অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলাটিতে নূর আলমের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। আদালতের আদেশের পর তিনি সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবীর পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের অনুরোধ করেন।
খোকনের ভাষ্য, ওই আইনজীবী একজন জুনিয়র আইনজীবী এবং তার ওপর পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা তুলনামূলকভাবে বেশি। ন্যায়বিচারের স্বার্থে তিনি জরিমানাটি মওকুফের আবেদন করেন বলেও জানান তিনি।
এ সময় আপিল বিভাগে মামলা কমে যাওয়া এবং এর ফলে আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন খোকন। তার দাবি, আগে আপিল বিভাগে একাধিক বেঞ্চে নিয়মিত মামলা শুনানি হতো। বর্তমানে বেঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে এবং এতে আইনজীবীদের পেশাগত আয়েও প্রভাব পড়ছে।
খোকন সাংবাদিকদের বলেন, আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের স্বার্থের কথা বলা তার দায়িত্ব। তিনি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কোনো তর্কে জড়ানোর উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেননি বলেও দাবি করেন।
অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের ভাষ্য, আদালত ওই মামলায় প্রতারণা ও গুরুতর তথ্য গোপনের বিষয় বিবেচনা করেই জরিমানার আদেশ দিয়েছিল। ফলে আদেশ পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই বলে প্রধান বিচারপতি জানান।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলে প্রধান বিচারপতি খোকনের কাছে জানতে চান, তিনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন যে জুবায়ের রহমান চৌধুরী প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকেই আইনজীবীদের আয় কমেছে। এ নিয়ে কথোপকথনের একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি খোকনের বক্তব্যকে “আদালত অবমাননার শামিল” বলে মন্তব্য করেন।
এরপর প্রধান বিচারপতি দিনের কার্যক্রমে আর অংশ নেবেন না বলে এজলাস ত্যাগ করেন। তার সঙ্গে বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরাও এজলাস ছাড়েন।
সুপ্রিম কোর্টের সরকারি নথিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের একাধিক বেঞ্চে বিচারপতিদের সমন্বয়ে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য পাওয়া যায়। আদালতের কার্যতালিকাতেও তার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের কার্যক্রম প্রকাশ করা হয়।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যে মামলাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত সেটির পেছনে দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধ রয়েছে। ২০১৬ সালে যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রারের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়। পরে একই বিষয়ে একাধিক রিট আবেদন করা হয় বলে আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হকের ভাষ্য, পরবর্তী রিটগুলোর কয়েকটিতে আগের মামলার আদেশ ও আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। বিষয়টি যাচাই করতে আদালত পুরনো নথি ও রেকর্ড পর্যালোচনা করে। এরপর আবেদনকারী ও তার আইনজীবীর ওপর জরিমানা আরোপ করা হয়।
তবে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। খোকন এটিকে আইনজীবীদের পক্ষে কথা বলার স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা মনে করছেন, আদালতের দেওয়া আদেশের পর এভাবে হস্তক্ষেপের উদ্যোগ নেওয়া সমীচীন হয়নি।
ঘটনাটি বিচার বিভাগ ও আইনজীবী সমাজের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তবে এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত বা আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
