দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । সাকিব আহমেদ ।
ঢাকার রাস্তায় এখন এআই ক্যামেরা বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সম্বলিত ক্যামেরাগুলো পুলিশের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর বেশ কিছু রাস্তায় বসানো হয়েছে এই অত্যাধুনিক ক্যামেরাগুলো। শুনেছি সুবিধাও নাকি পাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাস্তায় এমন একজন নীরব প্রহরী এসেছে যে কখনো ক্লান্ত হবে না, বিভ্রান্ত হবে না, আর “মামা, একটু দেখেন না, প্লিজ” বলে পারও পাওয়া যাবে না। তবে সত্যিকারের সুফল পেতে যথাযথ রক্ষনাবেক্ষন ও পর্যবেক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।
আপনি ঢাকায় যদি কখনো গাড়ি চালিয়ে থাকেন, তাহলে অভিনন্দন! আপনি জীবনের অন্যতম কঠিন মানসিক পরীক্ষায় বলা যায় সাফল্যের সাথেই উত্তীর্ণ হয়েছেন।
আমরা বাংলাদেশিরা প্রায়ই রসিকতা করে বলে থাকি, আমাদের দেশে ট্রাফিক নিয়ম মানে “বন্ধুত্বপূর্ণ উপদেশ ও অনুরোধের আসর”। অনেকের কাছে লাল বাতি শুধু সাজসজ্জা, লেন মানা বিদেশি সংস্কৃতি, আর হেলমেট পরা নির্ভর করে ট্রাফিক সার্জেন্টকে ২০০ মিটার দূর থেকে দেখতে পাওয়ার উপর। সড়কের অনিয়ম ও নিয়ম ভাঙার নিয়মে আমরা প্রায়ই মহাখালি থেকে ফার্মগেটের মাঝে শুধু জ্বালানি আর অফিসের সময়ই নয়, মানসিক শান্তিও হারিয়েছি।
ঠিক এই কারণে সরকারের নতুন এআই ট্রাফিক ক্যামেরা ব্যবস্থা নগরবাসীর অনেকের কাছে খুব স্বস্তিদায়ক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে।
প্রথমবারের মতো রাস্তায় এমন একজন প্রহরী বা পর্যবেক্ষক এসেছে যে কারো কথায়, টাকায় বা প্রভাবে নড়ে না, অথবা অদূরে অনুরোধে “মামা এইবারের মত একটু দেখেননা বা সামনের গলিতেই আমার বাসা “। ধনী-গরিব, বরের বিয়ে বাড়িতে তাড়াতাড়ি পৌঁছানোর ব্যাস্ততা, বন্ধুদের সাথে রাস্তার ওপারে চা খাওয়ার হুড়োহুড়িতে নিয়ম ভাঙা, এই সবই আইনের অনুসারী আবেগহীন এই পর্যবেক্ষকের কাছে সমান। সাধারণ মানুষ এই নতুন ব্যবস্থায় বেশ খুশি হচ্ছেন বলেই আমি ধারণা করছি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার বৈকি। দশকের পর দশক ধরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ছিল শুধু মানুষের হাতের ইশারা, বাঁশি ফুঁ আর নিরাপদে বাড়ি ফেরা তো অনেকটা ভাগ্যের উপর ভরসায়। এখন অন্তত প্রযুক্তির মাধ্যমে একটা স্মার্ট ও নিয়মতান্ত্রিক চেষ্টা শুরু হয়েছে। এটাই সবচেয়ে ভালো লাগছে, যা বাস্তবসম্মতও বটে।
আমরা আর বড় বড় রাজনৈতিক বক্তৃতা শুনতে চাই না, আমরা চাই স্বাভাবিক ও নিরাপদ সড়ক। এতো এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে, মেট্রো রেল এতো ফ্লাইওভার তৈরী হলো, তারপরেও ঢাকাবাসীর কপালে ‘জ্যামের কলংকের টিকা’ লেগেই আছে। এখনো রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মাঝে মাঝেই ৮ কিলোমিটার পথ পারি দিতে তিন ঘণ্টা লেগে যায়, করুন আর্তনাদে জ্যামে আটকে পরা অ্যাম্বুলেন্স কাঁদতে থাকে আর তাঁর বুকের ভেতরে থাকা রোগী ছটফট করতে থাকে। নগরীর রাস্তা কিন্তু অপ্রশস্ত নয়, নিয়মটাই শুধু নেই, নিয়ম মানার তাগিদও নেই। তাই রাস্তায় যদি সত্যিকারের শৃঙ্খলা আসে, মানুষ সেটা স্বাগত জানাবে তা বলাই বাহুল্য।
এই উদ্যোগকে অনেকে প্রধানমন্ত্রীর আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শাসনের অংশ হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক মতভেদ যাই থাকুক, বুদ্ধিমান ট্রাফিক ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে বড় বড় বিলবোর্ডের চেয়ে অনেক বেশি কাজের। সত্যি বলতে, আমাদের রাস্তায় কিছু শৃঙ্খলা খুবই দরকার।
প্রতিদিন আমরা দেখি “বাংলা টেসলা” কোনো নিয়মের ধার ধারে না, স্বগৌরবে উল্টো রাস্তায় চলছে সাথে আছে কিছু মোটরসাইকেলও। পাবলিক বাসতো রাস্তার রাজা, সে ব্যাস্ত রাস্তার ঠিক মাঝখানে যাত্রী নামায় আবার উঠাও, সবেচেয়ে মজার এবং আতঙ্কের ব্যাপার হলো রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়েই যাত্রীর জন্যে অপেক্ষা করতে থাকা। কি শহরে কি মহাসড়কে বাস হলো অবিসংবাদিত রাজা, বাসের কারণেই ট্রাফিক জ্যাম নগরে সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। নগরের পথচারীরা রাস্তা পার হওয়ার সময় যে সাহস দেখান, তা তাদের শারীরিক সক্ষমতার চূড়ান্ত প্রতীক, বয়স লিঙ্গ নির্বিশেষে দৌড়ে রাস্তা পার হওয়া আর চলন্ত গাড়ি-ঘোড়া তাদের এক হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বীরদর্পে রাস্তা পার হয়ে যান, গাড়ী থামলো কি না তা বড় ব্যাপার নয়, এ যেন রিদয়ে ধারণ করে “আমাকে দাবায়া রাখতে পারবনা। ” তাই সড়কে মৃত্যুও কমছে না।
এআই ক্যামেরা হয়তো সব সমস্যা একদিনে সমাধান করতে পারবে না, কিন্তু এখন অন্তত কেউ সবসময় দেখছে, সব নজরে রাখছে। সবচেয়ে ভালো দিক হলো, প্রযুক্তি অজুহাত শুনবে না, শুধু একশন। ক্যামেরা যা দেখে তাই রেকর্ড হয়। কোনো তর্ক নেই, গল্প নেই, “স্যার, আসলে আমি সিগন্যাল ভাঙিনি” বলে পার পাওয়া নেই।
অবশ্য প্রযুক্তি একাই সব ঠিক করতে পারবে না। ভালো রাস্তা, শক্তিশালী পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, সচেতনতা সবকিছুর দরকার আছে। ঢাকা একদিনে সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে না।
তবে অগ্রগতি তো একসাথে আসে না। ছোট ছোট স্মার্ট সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হয়।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাংলাদেশ পুরনো ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। আধুনিক শহরগুলো এখন প্রযুক্তি ও তথ্যের উপর নির্ভর করে। এই ভীষণ বুদ্ধিমান ক্যামেরা যেমন ট্রাফিক ব্যাবস্থায় নজর রাখবে তেমনি নগরবাসীর জান ও মালের নিরাপত্তায় কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস। প্রযুক্তির সুষ্ঠ ও কার্যকরী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, এটি এখন আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষ হয়তো এআই অ্যালগরিদম বোঝে না, কিন্তু তারা বোঝে রাস্তায় যদি একটু শান্তি আসে, যদি নিরাপদে আপনজনের কাছে বাড়ীতে ফেরা যায় তবে জীবন অনেকটা সহজ হয়।
ক্যামেরা কখনো চোখ বন্ধ করে না এ কথা তো সত্য কিন্তু যে বা যারা এটিকে নিয়ন্ত্রণ করবেন তাদের দায়িত্বশীল ও সৎ হওয়াও একই সাথে খুব জরুরী।
