দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
ইরানকে ঘিরে পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রচারণায় নারী স্বাধীনতার সমালোচনা একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে হাজির করা হয় ইসলামী পোশাক ও প্রতিবাদের দৃশ্যমানতা দিয়ে। হিজাব, বিক্ষোভ বা কিছু ভাইরাল ছবিকে সামনে রেখে তৈরি করা হয় একটি একরৈখিক গল্প। কিন্তু পরিসংখ্যান, শিক্ষা ও পেশাগত অগ্রগতির বাস্তব চিত্র দেখলে বোঝা যায়, ইরানের সমাজ বাস্তবতা পশ্চিমা বয়ানের চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং মর্যাদাপূর্ণ।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইরানে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের সাক্ষরতার হার প্রায় ৮৫.১ শতাংশ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার প্রায় ৯৮.৯ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের নারীরা প্রায় সবাই শিক্ষিত। এটি কেবল সংখ্যার সাফল্য নয়, বরং সামাজিক অগ্রগতির একটি শক্ত ভিত্তি।
স্বাস্থ্যখাতে নারীদের উত্থান আরও বিস্ময়কর। ১৯৭৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ইরানে মোট মেডিকেল স্পেশালিস্টের সংখ্যা বেড়েছে ৩৩২ শতাংশ। কিন্তু নারী মেডিকেল স্পেশালিস্টের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯৩৩ শতাংশ। সক্রিয় নারী চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বেড়েছে এক হাজার শতাংশেরও বেশি। এটি স্পষ্ট করে যে স্বাস্থ্যখাতে নারীরা কেবল অংশ নিচ্ছে না, নেতৃত্বের জায়গাও তৈরি করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বর্তমানে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি নারী। STEM বিষয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট নারী। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ সত্ত্বেও শিক্ষা ও গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণ থেমে নেই। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ৪৬ শতাংশ।
সবচেয়ে আলোচিত কিন্তু কম প্রচারিত তথ্য হলো পারমাণবিক বিজ্ঞান। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের প্রায় ৪০ শতাংশ নারী। যেখানে বৈশ্বিক গড় মাত্র ২২.৪ শতাংশ। ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান নিজেই এই সংখ্যাকে ব্যতিক্রমী বলে উল্লেখ করেছেন।
এই বাস্তবতাগুলো পশ্চিমা গণমাধ্যমে খুব কমই জায়গা পায়। বরং ভাইরাল করা হয় এমন ছবি বা প্রতিবাদ, যা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক মানদণ্ডের সঙ্গে মানানসই। হিজাবকে সরাসরি পরাধীনতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, অথচ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও চিকিৎসায় নারীর শক্ত অবস্থানকে প্রায় উপেক্ষা করা হয়।
এখানে স্মরণযোগ্য এডওয়ার্ড বার্নেসের “Illusion of Choice” ধারণা। যিনি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে নির্দিষ্ট আচরণকে স্বাধীনতার প্রতীক বানিয়ে মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এক সময় সিগারেটকে যেমন নারীমুক্তির প্রতীক বানানো হয়েছিল, আজ তেমনই কিছু দৃশ্যকে স্বাধীনতার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানকে বুঝতে হলে পশ্চিমা প্রচারণার বাইরে এসে তথ্য, পরিসংখ্যান ও সামাজিক বাস্তবতা দেখার প্রয়োজন আছে। ইরানি নারীরা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও শিক্ষা, বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ খাতে মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। এই বাস্তবতাই ইরানের সামাজিক শক্তি ও আত্মমর্যাদার প্রকৃত প্রতিফলন।
সূত্র: ইরানি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান, আন্তর্জাতিক গবেষণা তথ্য
