দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মিত ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কাটা পড়েছিল পাহাড়, হারিয়েছিল সংরক্ষিত বনভূমি এবং উজাড় হয়েছিল প্রায় আড়াই লাখ গাছ। পরিবেশগত সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রেলপথের দুই পাশে ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে দেখা যাচ্ছে, রোপণ করা চারাগুলোর বড় একটি অংশের আর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সম্প্রতি বন বিভাগের এক জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। জরিপ অনুযায়ী, রেলওয়ের লাগানো প্রায় ৪ লাখ ৫৩ হাজার গাছের চারার কোনো হদিস নেই। নির্বাচিত সাতটি প্লটে পরিচালিত পরিদর্শনে দেখা গেছে, গড়ে মাত্র ৩৭ শতাংশ চারা টিকে আছে। এর মধ্যে অধিকাংশই আকাশমণি প্রজাতির, যা পরিবেশবিদদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত ও অনুপযুক্ত বলে উল্লেখ করে আসছেন।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের প্রায় ২৭ কিলোমিটার অংশ চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার প্রায় ২০৭ একর বনভূমি রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করে। সেই সময় প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রেললাইনের দুই পাশে বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে এখন খালি জমি। কোথাও কোথাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু আকাশমণি গাছ টিকে থাকলেও অধিকাংশ স্থানে চারার কোনো চিহ্ন নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রথম দিকে কিছুদিন পাহারাদার থাকলেও পরে আর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। ফলে গরু-ছাগলের বিচরণ, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা এবং অবহেলার কারণে অধিকাংশ চারা নষ্ট হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নাহার বেগম বলেন, কয়েক বছর আগে বিপুল পরিমাণ চারা লাগানো হয়েছিল। শুরুতে কিছু তদারকি থাকলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। তার মতে, যথাযথ পরিচর্যা ও সুরক্ষার অভাবেই অধিকাংশ চারা বাঁচেনি।
অন্যদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পের সাবেক পরামর্শক এ এন এম খসরু দাবি করেছেন, প্রায় শতভাগ চারা টিকে আছে এবং চলতি বছরের এপ্রিলে পরিচালিত এক যৌথ গণনায় ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি গাছ পাওয়া গেছে। তবে বন বিভাগের জরিপ সেই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তথ্য তুলে ধরেছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চারা রোপণ করলেই বনভূমির ক্ষতি পূরণ হয় না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক কামাল হোসাইন বলেছেন, একটি প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার করতে কয়েক দশক সময় লাগে। চারাগুলো টিকে গেলেও প্রকৃত জীববৈচিত্র্য ফিরতে অন্তত ৩০ বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, রেললাইনের দুই পাশে মাটিক্ষয়, প্রাণীর চলাচলে প্রতিবন্ধকতা এবং অপরিকল্পিত চারা রোপণের কারণে বন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অনেক স্থানে চারাগুলো বন বিভাগের নির্ধারিত দূরত্ব বজায় না রেখে ঘনভাবে লাগানো হয়েছিল, যা তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য অনুকূল নয়।
পরিবেশবিদদের মতে, এই ঘটনা শুধু গাছ হারানোর বিষয় নয়। এটি একটি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবেশগত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, প্রকৃত অবস্থা যাচাই এবং বন পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।
সূত্রঃ প্রথম আলো
