দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক । আমার দেশ ।
দেশে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি এসব চক্রের নেপথ্যের হোতা, মদদদাতা ও অপরাধে ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় ১৫৯টি এবং রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি গোষ্ঠীর তথ্য পাওয়া গেছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা ১ হাজার ২১৯। তাঁদের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত পুলিশি তালিকায় গ্যাং ও সদস্যের সংখ্যা ভিন্ন হওয়ায় এসব পরিসংখ্যানকে সংশ্লিষ্ট তালিকার সময় ও পরিধি বিবেচনায় দেখা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক অন্য প্রতিবেদনেও রাজধানীতে ১৫৯টি গোষ্ঠীর তথ্য পাওয়া গেলেও সদস্যসংখ্যা ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের আশ্রয়দাতা, অর্থের জোগানদাতা এবং মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি, মাদক ব্যবসা ও অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধে জড়িত চক্রগুলোর নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াই এসব অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, হালনাগাদ তালিকা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধের ধরন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা এবং প্রাপ্ত আইনগত তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি কেন জরুরি
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক, শিক্ষাজীবন, সামাজিক পরিবেশ এবং কিশোরদের মানসিক বিকাশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই অপরাধ সংঘটনের পর গ্রেপ্তারের পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগের মতে, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব, পারিবারিক কলহ, বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া এবং অবসর সময় ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগের অভাব কিশোরদের অপরাধী চক্রের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তিনি বলেন, এলাকার প্রভাবশালী বড়দের অনুসরণ, দলবদ্ধ আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের পরিচিতি তৈরির চেষ্টা দিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোষ্ঠীগত সম্পর্কের সূচনা হয়। পরে এসব সম্পর্কের সঙ্গে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি ও অস্ত্র বহনের মতো অপরাধ যুক্ত হতে পারে। কিছু অপরাধী প্রাপ্তবয়স্কও কম বয়সীদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ।
এ পরিস্থিতিতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় সমাজকেও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের চিহ্নিত করে পরামর্শসেবা, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সহায়তা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অপরাধবিজ্ঞানী।
স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল মনে করেন, সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, পড়াশোনায় মনোযোগ কেমন এবং আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেদিকে অভিভাবকদের নজর রাখা জরুরি।
স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় অনলাইনে থাকা, রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার প্রবণতা কিশোরদের দৈনন্দিন জীবন ও পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে শুধু পোশাক, চুলের ধরন কিংবা দলবদ্ধভাবে চলাফেরার কারণে কোনো কিশোরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। বরং তার আচরণ, পারিবারিক পরিস্থিতি ও শিক্ষাজীবনের পরিবর্তন বিবেচনা করে দায়িত্বশীলভাবে সহায়তা দিতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, মানসিক সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকার যেসব এলাকায় তৎপরতার তথ্য
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, বসিলা, মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার তথ্য রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি তালিকা অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগে ৩২টি এবং তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি গোষ্ঠীর তথ্য রয়েছে। থানা হিসেবে পল্লবীতে ১৪টি এবং মোহাম্মদপুরে ১৬টি গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব সংখ্যা তালিকা হালনাগাদ, অভিযান এবং গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাতে পারে।
অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. সায়েদুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পাশাপাশি তাদের পেছনে থাকা আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযান ও পুনর্বাসন একসঙ্গে জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গ্রেপ্তার করে কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। অপরাধে জড়িত প্রাপ্তবয়স্কদের আইনের আওতায় আনা, মাদক ও অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ করা এবং অপরাধী নেটওয়ার্কের অর্থায়ন ও আশ্রয়ের উৎস শনাক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের বয়স, অপরাধের ধরন ও সংশ্লিষ্টতার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে আইনসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, অপরাধের নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং পরিবার ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের আগেভাগে শনাক্ত করে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সহায়তার আওতায় আনতে পারলেই দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
