দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
স্পেনে দুটি উচ্চগতির ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেছেন রেলব্যবস্থার নিরাপত্তায় কোনো অবহেলা বা ত্রুটি পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার ২৮ অক্টোবর দেশটির তোলেদো প্রদেশের উর্দা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন সানচেজ। তিনি বলেন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে শেষ পর্যন্ত তদন্ত চালানো হবে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী বলেন একই বছরে দেশে দুটি বড় উচ্চগতির রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। রেলব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।উদ্ধারকাজ ও তদন্ত চলছে। দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

হতাহতের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্ঘটনার কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। তদন্তে ট্রেন পরিচালনা সংকেত ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাপদ্ধতির কার্যকারিতাসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কোনো একটি কারণকে দায়ী না করে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করছে কর্তৃপক্ষ।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দক্ষিণ স্পেনের কর্দোবা প্রদেশের আদামুজ এলাকায় দুটি উচ্চগতির ট্রেনের সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ওই দুর্ঘটনার পর দেশটির রেল অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নিরাপত্তা এবং পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বুধবারের দুর্ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় শোক চলাকালে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে জাতীয় পর্যায়ে শোক পালন করা হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের পরিবার ও আহতদের সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। সাংবাদিক রবার্তো গোমেজ জানান দ্রুতগতির ট্রেনটি থেমে যাওয়ার সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে যাত্রীদের জানানো হয় যে লাইনে যানজট রয়েছে। কিছুক্ষণ পর ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করে এবং এরপরই সংঘর্ষ ঘটে। তিনি বলেন ধাক্কাটা ছিল ভয়াবহ। বগিটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে ভেঙে যাওয়া বগির ভেতরে সব স্যুটকেস ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। গোমেজ নিজে সামান্য আহত হন। তবে তিনি জানান আরেক যাত্রী তার ওপর পড়ে যান এবং ওই যাত্রীর মাথায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়।

আমরা বুকে ও পাঁজরে গুরুতর আঘাত পাওয়া মানুষদের সহায়তা করতে পেরেছি। পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও মানসিকভাবে খুবই কষ্টদায়ক। কয়েক মিনিট পর তিনি এবং অন্যরা শেষ পর্যন্ত জানালা দিয়ে বের হতে সক্ষম হন।
এদুয়ার্দা নামের একজন তার দুটি বিড়াল নিয়ে ভ্রমণ করছিলেন। তিনি বলেন সংঘর্ষের ধাক্কায় তিনি সামনে ছিটকে পড়েন এবং তার আসনের সামনের টেবিলটি ভেঙে যায়। আশপাশের অনেক যাত্রী আঘাত পান। ট্রেন থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি চিৎকারের শব্দ শুনতে পান এবং একটি বগিতে আগুন জ্বলতে দেখেন। তিনি আরও বলেন ট্রেনের নিচে নিহত ব্যক্তিদেরও তিনি দেখতে পান।
অন্যদিকে মিগেল আঞ্জেল পেরেজ উচ্চগতির ট্রেনটিতে ছিলেন যখন তিনি একটি ভয়ংকর সংঘর্ষের শব্দ শুনতে পান। তিনি বলেন বগিটি আংশিকভাবে উল্টে গিয়েছিল। খোলা ট্রে টেবিলের আঘাতে কিছু যাত্রী জখম হন। তবে সৌভাগ্যবশত খুব কম মানুষই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমরা ট্রেনটিকে নড়তে লাইনচ্যুত হতে এবং একদিকে হেলে পড়তে অনুভব করেছি। কয়েক সেকেন্ড ছিল ভয়ংকর।
দুটি বড় দুর্ঘটনার পর স্পেনের রেলব্যবস্থায় জনআস্থা পুনরুদ্ধার এখন সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সূত্রঃ রয়টার্স, এল পাইস, দ্য গার্ডিয়ান
