দ্য সিভিলিয়ানস । যুগের গল্প ।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, ১৯৭২ সালের মধ্যেই সেই স্বপ্ন বিবর্ন ও ফিকে হতে শুরু করে। যুদ্ধশেষে দেশ ছিল ধ্বংসস্তূপে পরিণত। অবকাঠামো ভাঙা, শিল্প কারখানা অচল, কৃষি ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। এই কঠিন বাস্তবতায় মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নেতৃত্ব দেশকে ধীরে ধীরে দাঁড় করাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল তার উল্টোটা।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫, এই সাড়ে তিন বছরে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে ভয়, ক্ষুধা আর বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা। প্রশাসন দুর্বল ছিল না, বরং দলীয়করণে ভেঙে পড়েছিল। সরকারি হিসাবেই দেখা যায়, ১৯৭৪ সালে খাদ্য উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় খুব বেশি কমেনি। তবুও দুর্ভিক্ষ হলো। কারণ খাদ্য ছিল, কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় পরে বলা হয়, এটি ছিল মূলত “ম্যান-মেড ফ্যামিন” বা মানুষে তৈরী করা দুর্ভিক্ষ। মজুদদারি, চোরাচালান প্রশ্রয় দেওয়া আর প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসাবেই প্রায় ২৭ হাজার মানুষের মৃত্যু স্বীকার করা হয়। বেসরকারি গবেষক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা কয়েক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। গ্রামবাংলায় মানুষ ঘাস, শেকড়, মৃত পশুর মাংস এমনকি আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত খাবার খেয়েছে কাক, কুকুর বেড়ালের সাথে। রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষের লাশ খুবলে খেয়েছে কুকুর, এই দৃশ্য বহু বিদেশি সাংবাদিক তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন।
এই দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে প্রতীকী চিত্র হয়ে আছে কুড়িগ্রামের বাসন্তী। কাপড় কেনার সামর্থ্য না থাকায় তাকে মাছ ধরার জাল পরতে হয়েছিল। এটি শুধু একজন নারীর গল্প নয়, এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার নগ্ন দলিল। ঠিক সেই সময়েই রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা পরিবারগুলোতে চলেছে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে, উৎসব আর বিলাসিতা। ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত আছে যে, দুর্ভিক্ষের মাঝেই শাসক পরিবারের বিয়ে রাজকীয় আয়োজন হয়েছিল সোনার মুকুট পরে, যখন মানুষ এক মুঠো খাবারের জন্য হাহাকার করছে। এই বৈপরীত্য মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে।
ত্রাণ ব্যবস্থাও ছিল ভয়াবহভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। বিদেশ থেকে আসা খাদ্য সহায়তা, কম্বল, চাল সবকিছুই দলীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীদের গুদামে চলে যেত। অনেক জায়গায় ত্রাণ পেতে হলে রাজনৈতিক পরিচয় দেখাতে হতো। খোদ সরকারপ্রধান একপর্যায়ে বলেছিলেন, তিনি একটি “চোরের খনি” পেয়েছেন। এই বক্তব্য নিজেই প্রমাণ করে, দুর্নীতি কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল।

বিরোধী মত দমনের জন্য গঠন করা হয় জাতীয় রক্ষীবাহিনী। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ১৯৭২–৭৫ সময়কালে রক্ষীবাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূতভাবে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। গুম, ক্রসফায়ার, রাতের আঁধারে ধরে নিয়ে যাওয়া এসব তখন স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। আজও বহু পরিবার জানে না তাদের বাবা, ভাই বা ছেলের কবর কোথায়।
ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালে সব পত্রিকা বন্ধ করে মাত্র চারটি সরকারি নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা চালু রাখা হয়। ‘বাকশাল’ কায়েমের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। সংসদ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। মানুষের ভোটাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবকিছুই বিলুপ্ত হয়।
ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক খাতেও ছিল চরম নৈরাজ্য। দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হতো, যা ফেরত আসত না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়েই দেশের অর্থনৈতিক ভিত ভেঙে পড়ে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো, এই সবকিছুই সাধারণ মানুষকে চুপ করে সহ্য করেতে হয়েছিল। কারণ প্রতিবাদ করার সুযোগ ছিল না। ভয় ছিল, ক্ষুধা ছিল কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা ছিল না।
এই সাড়ে তিন বছর ছিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে অন্ধকার সময়গুলোর একটি। এই ইতিহাস অস্বীকার করলে, বা একে আড়াল করলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনোই বুঝবে না কেন পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতি এতটা বদলে গেল। ইতিহাস শুধু গৌরবের গল্প নয়। ইতিহাস সেই কান্না, সেই না বলা কষ্ট, সেই ক্ষুধার্ত মুখ যেগুলো আমাদের চোখে চোখ রেখে আজও প্রশ্ন করে: এই স্বাধীনতা কি আমরা এ জন্যই চেয়েছিলাম?
