দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক । বিশেষ প্রতিবেদন ।
ঢাকা ১৭ মে ২০২৬ : তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারাজ, সীমান্তভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক যোগাযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাম্প্রতিক কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সম্ভাব্য অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তার বিষয়টি ভারতীয় কৌশলগত মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষি, সেচ এবং পানি ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে ভারত আশঙ্কা করছে, চীনের সম্পৃক্ততা উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স, আল জাজিরা এবং সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ক্রমেই কৌশলগত মাত্রা পাচ্ছে। বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদী এবং যোগাযোগ অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
এদিকে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়েও আলোচনা তীব্র হয়েছে। সরকার বলছে, এটি দেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে ভারতীয় কিছু বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, নদীকেন্দ্রিক বড় প্রকল্পগুলো আঞ্চলিক পানি বণ্টন রাজনীতিকে আরও জটিল করতে পারে।
উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাটসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনাও নতুন মাত্রায় আলোচিত হচ্ছে। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “সামরিক ঘাঁটি” বা “গোপন প্রতিরক্ষা জোট” নিয়ে নানা দাবি ছড়িয়েছে, এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য সরকার প্রকাশ করেনি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ, বাঁধ, খাল খনন এবং প্রশাসনিক উপস্থিতি বাড়ানোকে সরকার কৌশলগত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখছে। এতে সীমান্ত অঞ্চলে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পেতে পারে।
চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার নিয়েও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা বাড়ছে। চীনের সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তি, নদী ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা আলোচনায় রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট বা আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রকাশ্যে আসেনি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে “মাল্টি ভেক্টর ফরেন পলিসি” বা বহুমুখী ভারসাম্যভিত্তিক কূটনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে। অর্থাৎ ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের কিছু পদক্ষেপ বিরোধীদের কাছ থেকেও বেশ প্রশংসাও পেয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার প্রশ্ন, জাতীয় স্বার্থের ভাষা ব্যবহার এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।
যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক তথ্য এখনো যাচাই করা যায়নি। “ভারত বড় সংকটে” কিংবা “বাংলাদেশ গোপন সামরিক জোটে যাচ্ছে” ধরনের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক বা সরকারি প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আরও আত্মবিশ্বাসী ও স্বার্থকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের চেষ্টা করছে। তবে এই কৌশল সফল করতে হলে আঞ্চলিক ভারসাম্য, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।
সূত্র : রয়টার্স, আল জাজিরা, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
