লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

বাঁধনের উপর হামলা করে গণতন্ত্রকেই আঘাত করা হয়েছে

প্রকাশিত: 10 সেপ্টেম্বর 2026

12 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । শাওন আরাফাত ।

কেউ রাজনৈতিক স্লোগানে নিজেকে ঢেকে নিলেই তার গুন্ডামি রাজনীতিতে পরিণত হয় না। এই ভান আমাদের বন্ধ করতে হবে। রাজনীতি হলো মতের প্রতিযোগিতা। আর গুন্ডামি বা অযাচিত শক্তি প্রদর্শন হলো সেই মতকে নীরব করে দেওয়ার চেষ্টা। মানুষ যখন আর কাউকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারে না তখন চাপ, অপমান ও শক্তি প্রয়োগের পন্থা বেছে নেয়। এতে শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই হুমকির মুখে পড়ে না, গণতন্ত্রের মূল ধারণাটিও বিপন্ন হয়। ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা এই বাস্তবতারই এক উদ্বেগজনক উদাহরণ। রাজনৈতিক শত্রুতা কীভাবে সেই সীমা অতিক্রম করতে পারে, এই ঘটনা তা দেখিয়ে দিয়েছে।

বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক মতানৈক্যের কারণে একদল বাংলাদেশি প্রবাসী ইতালির মেস্ত্রের একটি পার্কে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ঘিরে ধরে হয়রানি করেন। তাঁর অভিযোগ, হামলাকারীরা তাঁর দিকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারেন, তাঁর হাত থেকে মোবাইল ফোন ফেলে দেন এবং কানের কাছে আঘাত করেন। তাঁর ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। ওই সময় সেখানে একটি শিশুও উপস্থিত ছিল। বাঁধন আরও দাবি করেছেন, ঘটনার ভিডিও ধারণের সময় দলটি তাঁকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক স্লোগান দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করে।

অবশ্যই এগুলো অভিযোগ। প্রকৃত ঘটনা ইতালির কর্তৃপক্ষকেই তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তদন্তে যদি অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে আমাদের নড়ে চড়ে বসার সময় হয়েছে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের কণ্ঠ সোচ্চার করার সময় হয়েছে।  এই আচরণকে যা বলা দরকার, তা হলো গুন্ডামি। এর চেয়ে ভালো কোনো নাম নেই।

ঘটনার প্রেক্ষাপট এই বিষয়টিকে আরও লজ্জাজনক করে তুলেছে। বাঁধন ইতালিতে গিয়েছিলেন ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে। তিনি সেখানে গিয়েছিলেন দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। তিনি কোনো রাজনৈতিক যোদ্ধা হিসেবে নয়, একজন শিল্পী হিসেবে সেখানে ছিলেন। তাঁর উপস্থাপন করার কথা ছিল চলচ্চিত্রকে। আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কণ্ঠ তুলে ধরার কথা ছিল। এর পরিবর্তে তিনি অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাঁর স্বদেশীয় দুর্বৃত্তরাই তাঁকে সেখানে হেনস্তা করেছেন।

বাঁধনের বিশ্বাস বা রাজনৈতিক মতামত নিয়ে আমরা একমত নাও হতে পারি। কিন্তু তাঁকে অপমান বা হুমকি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। শিল্পীরা সমাজের আয়না এবং তাঁরাও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখেন। এর অর্থ এই নয় যে তাঁদের মতামতের সঙ্গে একমত হতে হবে। এর অর্থ হলো, ভয় ছাড়াই তাঁদের সৃষ্টি করার, কথা বলার এবং জনজীবনে অংশ নেওয়ার অধিকারকে স্বীকার করা।

কারও সঙ্গে মতবিরোধ হলে তাঁর সত্তাকে আক্রমণ না করে তাঁর বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। আমরা বাঁধনের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করতে পারি, তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করতে পারি অথবা তাঁর অবস্থানের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করতে পারি। কিন্তু একটি মতের জবাব দিতে হবে আরেকটি মত দিয়ে। একটি যুক্তির জবাব দিতে হবে আরও শক্তিশালী যুক্তি দিয়ে। আলোচনায় যখন শারীরিক শক্তি ঢুকে পড়ে, তখন রাজনৈতিক বিতর্ক ব্যর্থ হয়ে যায়।

এদিকে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে  সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বাঁধন ইতালির পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং জড়িত থাকার অভিযোগে আট বাংলাদেশি নাগরিকের নাম উল্লেখ করেছেন। প্রাপ্ত ভিডিও বিশ্লেষণ করে বাংলাফ্যাক্টও প্রাথমিকভাবে জড়িত পাঁচজনকে শনাক্ত করেছে। তবে শনাক্ত হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। ইতালির কর্তৃপক্ষকে প্রমাণ পরীক্ষা করতে হবে, সাক্ষীদের বক্তব্য নিতে হবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তির দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কেউ অপরাধ করে থাকলে আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। কোনো সম্পর্ক বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কাউকে জবাবদিহি থেকে রক্ষা করতে পারে না। একইভাবে শুধু অভিযোগ এর কারণেও কেউ দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত নয়।

এই ঘটনা আমাদের আরও বড় একটি সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করায়। রাজনৈতিক মতবিরোধ এত ব্যক্তিগত হয়ে উঠল কেন? আমরা সমালোচনাকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখি কেন? রাজনৈতিক তকমা এত সহজে বিরোধীদের শত্রুতে পরিণত করে কেন? যদি এমনটা হয়, তবে যুক্তির জায়গা দখল করে নেবে শত্রুতা। আর শত্রুতা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। এভাবেই একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পচে যেতে শুরু করে।

এ ধরনের সংস্কৃতির পরিণতি আমরা আগেও দেখেছি। রাজনৈতিক বিদ্বেষ সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন ধ্বংস করতে পারে। অথচ আমরা কেবল তখনই আগ্রাসন বা হিংস্রতার নিন্দা করি যখন তা অন্য পক্ষ থেকে আসে। এই দ্বিচারিতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। নীতি তখনই অর্থবহ হয় যখন তা নিজের স্বার্থে নয়, সব পক্ষের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়। যে-ই সহিংসতা করুক, তার নিন্দা করতে হবে। ভুক্তভোগীর পরিচয় দেখে আমাদের প্রতিক্রিয়া বদলানো উচিত নয়।

এ কারণে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব স্পষ্ট। ইতালির তদন্তকারীদের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। কী ঘটেছিল তা নির্ধারণের আগে তাঁদের প্রাপ্ত ভিডিও পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিতে হবে। একই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের উচিত বাঁধন ও তাঁর পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা ও সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং তাঁদের আইনি সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করা। শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ হয় না। বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকদের জন্য সরকারের কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকেও তাদের সমর্থকদের ঘিরে তৈরি হওয়া সংস্কৃতি নিয়ে ভাবতে হবে। নেতারা যদি প্রতিপক্ষকে সব সময় শত্রু হিসেবে তুলে ধরেন, তাহলে তাঁদের কিছু অনুসারী সীমা অতিক্রম করলে বিস্মিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। রাজনৈতিক আনুগত্য কখনো সহিংসতার লাইসেন্স হতে পারে না। যারা ভিন্নমত পোষণ করে তাদের নীরব করানোর ক্ষমতা দিয়ে রাজনৈতিক শক্তি পরিমাপ করা উচিত নয়। নেতাদের স্পষ্ট করে বলতে হবে, রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য শৃঙ্খলা দরকার, সহিংসতা নয়।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনীতির কাজ হলো মানুষকে বোঝানো, প্রশ্ন করা এবং প্রতিযোগিতা করা। রাজনীতি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করবে যেখানে মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু সেই মতবিরোধ ব্যক্তিগত যুদ্ধে পরিণত হবে না। আমরা ক্ষুব্ধ হতে পারি। আমরা আপসহীন হতে পারি। অন্যের অবস্থান সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারি। কিন্তু তীব্র বিতর্ক ও শারীরিক ভয় দেখানোর মধ্যে একটি সীমারেখা অবশ্যই থাকতে হবে। সেই সীমা অতিক্রম করা শক্তির পরিচয় নয়। এটি প্রমাণ করে যে যুক্তি শেষ হয়ে গেছে।

বাঁধন বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্বকারী একজন শিল্পী হিসেবে ইতালিতে গিয়েছিলেন। গল্পটি এমনই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে  তার উপর আক্রমণ একটি অন্ধকার বাস্তবতার দিকে আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক শত্রুতা কত সহজে দেশের সীমানা পেরিয়ে ব্যক্তিগত প্রতিশোধে পরিণত হতে পারে, এই ঘটনা তা দেখিয়েছে।

চলুন, সীমারেখাটি স্পষ্ট করি। আমাদের সঙ্গে তর্ক করুন। আমাদের বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করুন। আমাদের ভুল প্রমাণ করুন। কিন্তু আমাদের ওপর হামলা করবেন না। রাজনীতি যে মুহূর্তে মত ও যুক্তি ছেড়ে জবরদস্তির পথ বেছে নেয়, সে মুহূর্তে তা আর গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা থাকে না। তা পরিণত হয় গুন্ডামিতে। আর রাজনীতির নামে এমন গুন্ডামি আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না।

 লেখক দ্য ডেইলি অবজারভারের সম্পাদকীয় সহকারী।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman