লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

ছেলের চোখে ঈদ আনন্দ, বাবার হৃদয়ে অক্ষমতার দীর্ঘশ্বাস

প্রকাশিত: 09 মে 2026

46 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।

যখন আমার ১৪ বছর বয়সের ছেলের দিকে তাকাই, তখন নিজের ছোটবেলাটাকে দেখতে পাই। আর যখন বাবার দিকে তাকাই, তখন নিজের অক্ষমতাগুলো চোখে পড়ে।

আমি আমার সময়ের কুরবানির ঈদ নিয়ে কথা বলছিলাম। ছোটবেলার সেই স্মৃতিগুলো এখনো আকাশের উজ্জ্বল তারার মতো ঝলমল করে।
আমি একটা সম্মানিত মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মেছি। আমার বাবার ছয় ভাই, মোট ৭ ভাই। আমি ঢাকায় একটা যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি।

আমরা দুই ভাই, দুজনেই প্রাণীদের খুব ভালোবাসতাম এবং এখনো ভালোবাসি। কিন্তু ওই সময় বাসায় পোষা প্রাণী রাখতে দেওয়া হতো না। তবু খুব ছোটবেলায় আমি জোর করে একটা বিড়ালছানা বাসায় নিয়ে এসেছিলাম। আমার বয়স তখন ৭ -৮ হবে, দেখলাম বস্তির ২-৩টা ছেলে, আমারই বয়সী, দড়ি দিয়ে একটা বিড়ালছানার গলায় বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। আমার ভীষণ মায়া হল, আমি তাদের কাছ বিড়ালটা চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা দিতে রাজি হয়নি। তখন ১৯৮৩-৮৪ সাল। আমি আম্মার কাছে দুই টাকা চাইলাম, কিন্তু কেন লাগবে সেটা বললাম না, ওই দুই টাকা দিয়ে বিড়ালটা কিনেছিলাম। বাসায় বিড়াল আনার পর অনেক ঝামেলা হয়েছিল, কিন্তু শেষে আম্মা মেনে নিয়েছিলেন।

ঠিক তেমনি গত বছর আমার দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চাচার কবর জিয়ারতে গিয়েছিলাম। সেখানে একটা বিড়ালছানা পেলাম। বাচ্চারা খুব উৎসাহ নিয়ে বিড়াল ছানাটি বাসায় নিয়ে আসতে চাইল। আমি আর না করতে পারলাম না। এখন সেই বিড়ালছানা আমাদের সাথেই আছে। আমরা তার নাম দিয়েছি তুনতুন।

দুই ভাই মিলে আমরা ঈদুল ফিতরের চেয়ে ঈদুল আজহার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতাম। আমাদের ছোটবেলায় ঈদের আগের প্রায় ৫-৬ দিন আগে থেকেই বাড়ির সামনে দিয়ে হটিয়ে হটিয়ে কোরবানির পশুগুলোকে অস্থায়ী হাটে নেওয়া হতো,রাস্তাঘাট গরু-ছাগলে ভরে যেত। পাড়ার বড় ছেলেরা বিকেলে কোরবানির পশুগুলোকে নিয়ে হাঁটতে বের হতো, আমরাও পেছনে পেছনে হাটতাম। কলাপাতা, আমপাতা, খড়—যা পেতাম তাই খাওয়ানোর চেষ্টা করতাম। আর নিজেদের কোরবানির গরুর জন্য আব্বাকে ক্রমাগত যন্ত্রনা দিতাম, হাটে যাওয়ার বায়না তো লেগেই থাকতো। ঈদের আগের দিনগুলো কেমন যেন উড়ে চলে যেত। নিজেদের পশু কুরবানি হওয়ার পর আমি অনেক কেঁদেছি। এখন আমার মেয়ে আর ছেলেও কাঁদে। তারা তাদের কোরবানির প্রাণীটার আবার নামও রাখে ।

একটু বড় হওয়ার পর আমরা দুই ভাই নিজেরাই হাটে চলে যেতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোরবানির গরু, ছাগল, মহিষ দেখে পার করে দিতাম। প্রতিদিন যেতাম। হাটে প্রথম গরু আসার পর থেকেই আব্বাকে বলতাম, এখনই আমাদের গরু কিনতে হবে।

সেই সময়কার মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ১ থেকে ৭ জন মিলে একটা গরু কিনত। কোরবানির নিয়মানুযায়ী বড় পশু যেমন, গরু-মহিষ এর ক্ষেত্রে সাতের বেশি ভাগ এক পশুতে দেওয়া যায় না। ওই সময় উচ্চমদ্ধবিত্ত ব্যাক্তিরা একাই একটি গরু কিনত।

নিজেদের গরু কেনা হয়ে গেলে পাড়ায় ঘুরে ঘুরে অন্যদের গরুর সাথে নিজেদের গরুর তুলনা করতাম এবং নিজেদের গরুই যে সেরা তা প্রমান করার চেষ্টা করতাম, এই নিয়ে বন্ধু ও বড় ভাইদের সাথে তর্ক-বিতর্কের কত শত মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ঈদের আনন্দের মাঝেও যাদের গরু-ছাগলের প্রতি ভালোবাসা ছিল, তাদের মন বেশ খারাপ হয়ে যেত, কারণ গরু বা ছাগলটি আর মাত্র কয়েক দিনের মেহমান। যখন কলেজে পড়ি তখন আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে একদম নিজেদের একটা গরু কোরবানির রেওয়াজ শুরু হয়। বড় হোক বা ছোট, আনন্দটা ছিল অসম্ভব।

পরিবার অনেক বড় হয়ে যাওয়ায় এখন আর আমাদের যৌথ পরিবার নেই, তাই যার যার বন্দোবস্ত তার তার নিজেরই করতে হয়। এখন আমি অনেক বড় হয়েছি, চাকুরী করছি, নিজের সংসার হয়েছে। কিন্তু বাবার মতো দায়িত্ব কাঁধে নিতে পারিনি, এই ভাবনা প্রায়ই আমাকে বিমর্ষ করে তোলে। ঈদুল আজহা আসছে। ছেলে প্রতিদিন জিজ্ঞাসা করে, “বাবা, আমাকে গরুর হাটে নিয়ে চলো। বড় বড় ষাঁড় দেখব। আমি একটা ছাগল কিনব।” বলে, “বাবা, জানো তো ঝুলকি (চাচাতো ভাই) একটা সুন্দর ছাগল কিনে ফেলেছে। আজ বিকেলে হাঁটাতে নিয়ে যাবে। আর দু’দিন পর গরুও কিনবে।” আমি বললাম, “পরের ঈদে আমরা গরু আর ছাগল দুটোই কিনব। আমাদেরটা তাদের চেয়েও সুন্দর হবে।” সে বলল, “গত বছরও তো এই কথা বলেছিলে।” আমার কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না। চুপ করে নিজেকে বললাম, “পরের বার ঠিক হয়ে যাবে।” বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ফেললাম। সেই পরের বারটা এখনো আসেনি।

চাকরি শুরু করার পর থেকে প্রতি কুরবানিতে একটা ছাগল কুরবানি দিতাম। সাধারণত ঈদের ৪-৫ দিন আগে কিনতাম। বাচ্চাদের আর নিজের আনন্দের জন্য। কিন্তু গত তিন – চার বছর ধরে আর পারছি না। খরচ বেড়েছে অনেকগুন, বাজার দর অনুযায়ী বেতন পাচ্ছিনা, কেন পাচ্ছিনা তাও জানিনা। প্রতি বছরই আমার বাচ্চাগুলোকে বেশ হতাশ করছি। আমার আব্বা আমাদের দুই ভাইকে কখনো হতাশ করেননি। বাচ্চারা চাকরি-জীবনের জটিলতা বোঝে না, বোঝার দরকারও নেই। ছোটবেলা তো চিন্তামুক্ত থাকারই সময়, যেমন আমার ছিল।

তাদের সুখের অনেকটাই নির্ভর করে আমার আয়ের ওপর। করোনার পর থেকে আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া। বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল সব বেড়েছে, কিন্তু আয় একই আছে।

মেয়ে কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী, ছোট ছেলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। তাদের টিউশন ফি আর অন্যান্য খরচ চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি একজন সাংবাদিক, যে অন্যের দুঃখ-কষ্ট ও বৈষম্যের কথা লেখায় বা ছবিতে তুলে আনি, কিন্তু আমার কথা কে বলবে? যথাযোগ্য বেতন বা মজুরির জন্য সরকারের অনেক নিয়মনীতি থাকলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান তা অনুসরণ করেনা। দেশের চাকুরীর বাজার ভালো না হওয়ায় চাকুরী বদলের সুযোগ ও অনেকটাই কম।

আমার ছোটবেলা আর যৌবনে ঈদের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করেছি। এখন আমার পালা,  বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তানদের আনন্দ দেওয়ার। কিন্তু কত চ্যালেঞ্জ। আব্বা কীভাবে সবকিছু এত সুন্দর করে সামলাতেন, সেটা এখনো আমার কাছে জাদুর মতো লাগে।

আমার বাচ্চারা সবার মতো ঈদের আনন্দ পেতে চায়। আমি একসময় আমার ছেলে-মেয়ের মতোই ছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমি আমার বাবার মতো যোগ্য হতে পারিনি।

সবার জীবনে ঈদ আনন্দ ছড়িয়ে দিক, সমাজ থেকে দুঃখ দূর করুক, প্রত্যেকের সকাল আনন্দে ভরে উঠুক। সব বাবাদের ঈদ মোবারক।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman