দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন একটি ভয়াবহ যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পর ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা ছয়টি দেশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে কিন্তু বিমানবাহী রণতরীগুলো আক্রান্ত হওয়ার উড়ো খবর এলেও প্রমাণিত কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
এই যুদ্ধে ইরানের টার্গেট নির্বাচনের কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন ইরান বিলিয়ন ডলারের নিউক্লিয়ার-চালিত বিমানবাহী রণতরী যেমন ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডকে আক্রমণ না করে মূলত স্থলভিত্তিক ঘাঁটিগুলোকে বেছে নিয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা দেখতে পাই যে ইরানের কৌশল হলো প্রতিশোধ নেয়া একই সাথে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের তীব্রতা এড়ানো। তবে এই সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে আমেরিকা ও ইসরায়েলের অর্থনৈতিক এবং সামরিক কেন্দ্রগুলোতে ইরানের হামলা আরো প্রকট ও অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠতে পারে।
প্রথমত, ইরানের বর্তমান টার্গেটগুলো দেখে নেয়া যাক। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মূলত বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে মিসাইল এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
বাহরাইনের মানামায় মার্কিন নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিটের সদর দপ্তরে আঘাত করে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া, কাতারের আল উদেইদ এয়ার বেসে রাডার সিস্টেমের গুড়িয়ে দেওয়া, কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানে ৬ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু। এগুলো ইরানের প্রতিশোধের প্রধান উদাহরণ।
সৌদি আরবে তেল শোধনাগার এবং ইউএইয়ের দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টও আক্রান্ত হয়েছে, যা অর্থনৈতিক ক্ষতির লক্ষণ। এই টার্গেটগুলো বেছে নেয়ার কারণ হলো, এগুলো ইরানের কাছাকাছি, সহজে আঘাত করা যায় এবং মার্কিন বাহিনীর কমান্ড এবং লজিস্টিক্সকে দুর্বল করা যায়। এছাড়া, এই হামলা দিয়ে ইরান মদ্ধপ্রাচ্চ্যের দেশগুলোতে বার্তা দিতে চায় যে আমেরিকা এবং ইসরাইলকে সহায়তার পরিনাম ভয়ঙ্কর হবে এবং একই সাথে তার মিত্রদের (যেমন হুথি, হিজবুল্লাহ) নিজেদের শক্তি সামর্থ্য প্রদর্শন করে নিজেদের দিকে আরো টেনে এনে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে চায়।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কেন বিমানবাহী রণতরীগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হলো? এগুলো তো আমেরিকার ‘শৌর্য এবং বীর্যের প্রতীক’, এবং ইরানের ব্যালিস্টিক (যেমন খাইবার, ফাত্তাহ) এবং হাইপারসোনিক মিসাইলের আওতায় আছে। রণতরীগুলোর চারপাশে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন, এজিস, এসএম-৩ মিসাইল মোতায়ন আছে, যা মিসাইল সোয়ার্ম যেমন, ৫০০ মিসাইলের একযোগে হামলাকেও প্রতিহত করতে পারে। এছাড়া, রণতরীগুলো দূরবর্তী সমুদ্রে (পারস্য উপসাগরের বাইরে) অবস্থান করে, যা ইরানের মিসাইলের নির্ভুলতাকে চ্যালেঞ্জ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এমন আক্রমণ করলে আমেরিকার ‘গর্ব খর্ব’ হয়ে যেতে পারে, যা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইরান জানে যে ঘাঁটিগুলোতে হামলা করে তারা প্রতিশোধ নিতে পারে, কিন্তু রণতরীগুলোতে আঘাত করলে পুরোমাত্রার যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে।
এখন প্রশ্ন,রণতরীগুলো আক্রান্ত হলে আমেরিকা কি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে? আমেরিকার নিউক্লিয়ার পলিসি (নিউক্লিয়ার পোসচার রিভিউ) অনুসারে, নিউক্লিয়ার অ্যাটাকের রেসপন্সে নিউক্লিয়ার ব্যবহার হতে পারে, কিন্তু কনভেনশনাল অ্যাটাক (মিসাইল বা ড্রোন) এর জন্য না। তবে, যদি রণতরীতে হাজার হাজার সেনা মারা যায় বা আমেরিকার ‘ভাইটাল ইন্টারেস্ট’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এসক্যালেশনের রিস্ক বাড়বে। আমেরিকার ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ পলিসি নেই, কিন্তু এটি সার্বিক ক্ষতি ও হুমকির উপর ভিত্তি করে। ইরান সম্ভবত এই ঝুঁকি এড়াতে চায়, কারণ পারমাণবিক যুদ্ধ তার ধ্বংস ডেকে আনবে।
মার্কিন যে সম্ভাব্য টার্গেটগুলো এখনও আক্রান্ত হয়নি, কিন্তু আমেরিকা ও ইসরায়েলের সর্বোচ্চ ক্ষতি করতে পারে: প্রথমত, সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারের মতো অয়েল ইনফ্রাস্ট্রাকচার, যা বিশ্বের তেল সরবরাহের ১০% নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের ডিমোনা নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট বা তেল-আভিবের অর্থনৈতিক কেন্দ্র। তৃতীয়ত, সাইপ্রাস বা ওমানের মতো নতুন টার্গেট, যা আঞ্চলিক অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে পারে। চতুর্থত, সাইবার অ্যাটাক আমেরিকার ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারে (ব্যাংক, পাওয়ার গ্রিড)। এগুলোতে হামলা করলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হবে এবং তখন উভয়পক্ষ এবং পশ্চিমা দেশগুলো আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
এই সংঘাত থেকে বোঝা যায় যে যুদ্ধ কখনো সমাধান নয়। ইরানের কৌশলগত নির্বাচন দেখিয়ে দেয় যে উভয় পক্ষই যুদ্ধের তীব্রতা এড়াতে চায়, কিন্তু একটি ভুল পদক্ষেপ সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করে শান্তি আলোচনা শুরু করতে হবে। বাংলাদেশের মতো শান্তিকামী দেশ হিসেবে আমরা এই যুদ্ধের বিরোধিতা করি এবং সকল পক্ষকে সংযমী হওয়ার আহ্বান জানাই। যুদ্ধের পরিণতি কেবল ধ্বংস।
