লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

জুলাই গণহত্যার দায়ে ৮০ পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত

প্রকাশিত: 10 জুলাই 2026

8 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

একটি গুরুত্বপূর্ণ জবাবদিহিতার পদক্ষেপ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৮০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডিআইজি থেকে শুরু করে এএসপি পদমর্যাদার এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিরীহ মানুষের ওপর ঠান্ডা মাথায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশক্রমে এই শুদ্ধি অভিযান চলছে। গতকাল বৃহস্পতিবার তিন কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এরা হলেন ৩৩তম বিসিএসের মিশু বিশ্বাস ও জুয়েল চাকমা এবং ৩৬তম বিসিএসের মাহমুদুল হাসান। তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি চালানো এবং আগের বছরগুলোতে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গুম ও হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অভিযুক্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের তালিকা
এই ৮০ জনের তালিকায় রয়েছেন ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, ডিবির সাবেক প্রধান হারুন অর রশিদ, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এসএম মেহেদী হাসান ও কেএম এহসানউল্লাহসহ অনেকে। অধিকাংশই বর্তমানে পলাতক এবং তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় হত্যা, বিস্ফোরক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বিপ্লব কুমার সরকার ৫ আগস্টের পর ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। হারুন অর রশিদ আন্দোলনকারীদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করা এবং আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগে অভিযুক্ত। প্রলয় কুমার জোয়ার্দার গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুরে এসপি থাকাকালে বিরোধীদলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার মানুষকে ঘরছাড়া ও পঙ্গু করে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। সৈয়দ নুরুল ইসলাম ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লাইভ বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের নির্দেশ দিতেন।

ঠান্ডা মাথায় হত্যার অভিযোগ
যাত্রাবাড়ী, পল্টন, উত্তরা ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর স্নাইপার ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে গুলি চালানোর হুকুমদাতা হিসেবে এদের নাম উঠে এসেছে। নিরীহ ছাত্র ও সাধারণ মানুষের বুকে সরাসরি গুলি করার ঘটনায় অনেক পরিবার আজও শোকে মুহ্যমান।

অতিরিক্ত এএসপি এসএম শামীমের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় একাই ১১টি হত্যা মামলা রয়েছে। তিনি ফ্যাসিবাদের পতনের শেষ মুহূর্তেও নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। সহকারী কমিশনার গোলাম রুহানীর বিরুদ্ধে ২২টির বেশি মামলা দায়ের হয়েছে বিভিন্ন থানায়। তিনি বিরোধী নেতাকর্মীদের ভুয়া মামলায় ফাঁসানো এবং সরাসরি গুলি করার জন্য কুখ্যাত ছিলেন।

২৮তম বিসিএসের এএসপি মো. আরিফুজ্জামান রংপুরের আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডসহ সাতটি হত্যা মামলার প্রধান আসামি। শহীদ আবু সাঈদের ওপর গুলি চালানোর সময় তিনি ফ্রন্টলাইনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আনিসুর রহমান ও অতিরিক্ত ডিআইজি জায়েদুল আলম উত্তরবঙ্গ ও নারায়ণগঞ্জে এমন ক্র্যাকডাউন চালিয়েছিলেন যে পুরো এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছিল।

তালিকায় আরও রয়েছেন বিপ্লব বিজয় তালুকদার, টুটুল চক্রবর্তী, নূরে আলম মিনা, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, মানস কুমার পোদ্দার, গোলাম মোস্তফা রাসেল, কাজী আশরাফুল আজীম, রিফাত রহমান শামীমসহ অনেকে। অধিকাংশই জুলাই বিপ্লবের পর ভারতে পালিয়ে গেছেন।

জবাবদিহি ও বিচারের প্রত্যাশা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা) কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ৫ আগস্টের পর ৮০ জন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান। তিনজনকে ইতোমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বাকিদেরও পর্যায়ক্রমে চাকরিচ্যুত করা হবে।

যাদের হাতে সাধারণ মানুষের রক্ত লেগে আছে, তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের আওতায় আনা এবং অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

২০০৯ সাল থেকে যখনই ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তখনই এসব কর্মকর্তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজেদের ব্যক্তিগত অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর ঠান্ডা মাথায় গুলি চালিয়ে যে রক্তস্নাত অধ্যায় রচিত হয়েছে, তার ক্ষত এখনও দেশের বুকে জ্বলজ্বল করছে।

এই চাকরিচ্যুতি শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, ন্যায়বিচারের পথে একটি ছোট্ট কিন্তু অর্থবহ পদক্ষেপ। ভিকটিমদের পরিবারগুলোর কাছে এটি সান্ত্বনার মতো হলেও, পূর্ণ বিচার না হওয়া পর্যন্ত শান্তি ফিরবে না। দেশের মানুষ আশা করছে, এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে এবং কোনো খুনি কর্মকর্তাই দায়মুক্ত থাকবেন না।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman