লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

কর্মক্ষেত্রের নীরব নির্যাতন, আইন কী বলে

প্রকাশিত: 08 সেপ্টেম্বর 2026

39 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।

অফিসের চার দেয়ালের ভেতর যে যুদ্ধটা চলে, তার শব্দ হয় না। কিন্তু সেই নীরব যুদ্ধে অনেক মানুষের আত্মবিশ্বাস, ক্যারিয়ার আর মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস হয়ে যায়। বাংলাদেশের অফিসগুলোতে একদল কর্মচারী অন্য একজন বা একদল কর্মীকে নানানভাবে অপদস্ত করে, ঠান্ডা যুদ্ধে হারিয়ে দেয়, এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়। এটা শুধু ব্যক্তিগত হিংসা নয়, বরং ক্ষমতার খেলা, নিজের অযোগ্যতাকে উঁচু গলায় আড়াল করা, রাজনৈতিক পক্ষপাত আর সামাজিক মানসিকতার এক জটিল মিশেল।

এমনটা কেন হয়?

কারণ অনেক। যে কর্মী কাজে একটু বেশি দক্ষ, তিনি হয়ে ওঠেন অন্যদের ভবিষ্যতের হুমকি। যিনি নিজের দায়িত্বের বাইরেও বাড়তি কাজ করে প্রতিষ্ঠানকে উপকৃত করেন, তিনিই আবার অন্যদের যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেন, তৈরি করেন চাকরি হারানোর ভয়। কখনো আবার নিছক ব্যক্তিত্বের কারণেই কাউকে অকারণ অপছন্দ করে বসে একটা গোষ্ঠী। বড় অফিসে সাধারণত দুই তিন বা তার বেশি অলিখিত দল থাকে, প্রত্যেকেই নিজের প্রভাব বাড়াতে চায়, নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় প্রতিষ্ঠানের।

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক কর্মীরা প্রতিপক্ষকে অকারণে কোণঠাসা করে ক্ষমতা জাহির করেন, এটা বহু পুরোনো চর্চা। প্রকৃত কাজের চেয়ে এই আধিপত্যের খেলাই যেন বেশি গুরুত্ব পায়। যে গোষ্ঠী প্রাধান্য বিস্তার করতে চায়, তারা লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটা নেতিবাচক বয়ান তৈরিতে ব্যস্ত থাকে, যাতে তিনি নিজের কাজটুকু ঠিকভাবে করতে না পারেন, আর সেই ব্যর্থতাকে পরে তাঁর বিরুদ্ধেই অস্ত্র বানানো যায়। ন্যায্য সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয় সুপরিকল্পিতভাবে, ট্যাগ লাগিয়ে চরিত্র হননের চেষ্টা চলে অবিরাম।

শেখ হাসিনার শাসনামলে এই কৌশলের এক ভয়াবহ রূপ দেখেছে দেশ। যেকোনো ন্যায্য প্রতিবাদ বা দাবি দমাতে তৎকালীন সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বলত, এটা জামায়াত শিবিরের কাজ। জামায়াত শিবিরের ইতিহাসে বিতর্কিত এক অধ্যায় নিঃসন্দেহে আছে, তা মোটামুটি সর্বজনস্বীকৃত সত্য। কিন্তু সরকার এই বয়ানকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল যে আইনের কোনো তোয়াক্কা না করেই মানুষ হত্যা বা বিনা দোষে আটক করাও তখন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছিল। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও এই তকমা লাগানোর চর্চা তুঙ্গে ছিল, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শুধু জামায়াত শিবির ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট ছিল। ভুক্তভোগী তখন সম্পূর্ণ অসহায়। দুঃখজনকভাবে এই ট্যাগিংয়ের চর্চা আজও ভালোভাবেই টিকে আছে, রূপ বদলে হয়তো নতুন নতুন লেবেল লাগে, সঙ্গে যুক্ত হয় বডি শেমিংয়ের মতো আরও অনেক কিছু।

আইন কী বলে এই বিষয়ে

সুখবর হলো, বাংলাদেশের আইন এখন আর এই বিষয়ে নীরব নয়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ ব্যাপকভাবে সংশোধন করে কর্মক্ষেত্রের সহিংসতা ও হয়রানি নিয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

আইনের ৭৯ নম্বর ধারায় সহিংসতা ও হয়রানির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে, কর্মক্ষেত্রের যেকোনো অগ্রহণযোগ্য আচরণ, চর্চা, একক বা দলবদ্ধ উৎপীড়নমূলক কার্যকলাপ, হুমকি কিংবা মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতন এর আওতায় পড়ে, যার ফল শারীরিক, মানসিক, যৌন বা অর্থনৈতিক ক্ষতি।

৩৩২ ধারায় বলা হয়েছে, কর্মজগৎ ও কর্মস্থলে সহিংসতা ও হয়রানি রোধে প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্বের কথা। এই ধরনের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ৩৩২ক ধারায় প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য, সহিংসতা ও হয়রানির অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। কেউ এই বিধান লঙ্ঘন করলে ৩০৭ক ধারা অনুযায়ী তাঁর ন্যূনতম বিশ হাজার থেকে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

তবে যেসব ক্ষেত্রে ট্যাগিং সরাসরি কারও সুনাম নষ্ট করে বা মানহানি ঘটায়, সেখানে দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৪৯৯ ও ৫০০ ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে, যেখানে মানহানির অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান আছে।

ভুক্তভোগীর করনীয়

প্রথম ধাপ হলো ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সংরক্ষণ করা, লিখিত বার্তা, ইমেইল বা সাক্ষীর বিবরণ। এরপর প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা,  যা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে থাকা এখন আইনি বাধ্যবাধকতা। প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা না নিলে শ্রম অধিদপ্তর বা শ্রম আদালতে অভিযোগ দায়ের করা যায়। মানহানির ঘটনায় সরাসরি ফৌজদারি আদালতেও মামলা করার সুযোগ আছে। এখন ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর একটা কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে।

কর্মক্ষেত্র হওয়া উচিত নিরাপদ ও সম্মানজনক। যেখানে মানুষ তার মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে এগিয়ে যাবে, সেখানে তাকে হিংসা আর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পিছিয়ে যেতে হবে না। বাংলাদেশের আইন ভুক্তভোগীর পাশে আছে। শুধু দরকার সাহস করে এগিয়ে আসা এবং সঠিক প্রক্রিয়ায় বিচার চাওয়া। নীরবতা আর সহ্য করার মানসিকতা পরিবর্তন করে আইনের পথে এগিয়ে আসলেই এই বিষাক্ত সংস্কৃতির অবসান সম্ভব।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman

taraftarium24casibomselcuksportstaraftarium24selcuksportscasibom