দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । শাহরিয়ার ফিরোজ ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের বেষ্টনীঘেরা গোলচত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যগুলো কেবল পাথর, ধাতু কিংবা কংক্রিটের তৈরি কিছু অবয়ব নয়। এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংগীত, শিল্পকলা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। অথচ সেই ভাস্কর্যগুলোর কোনো কোনোটির চোখ বাঁধা। কয়েকটি আবার পড়ে আছে ঘাসের ওপর, যেন তাদের আর কোনো মর্যাদা কিংবা প্রয়োজন নেই।
এই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জেগেছে একজন রিকশাচালকের মনেও। লেখকের রিকশাচালক মাজনু জানতে চেয়েছিলেন, ভাস্কর্যগুলোর চোখ বাঁধা কেন? কয়েকটি ভাস্কর্যই বা এভাবে ঘাসের ওপর পড়ে আছে কেন? সাধারণ মানুষের মনে জাগা এই সহজ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি লেখক।
এরপর রিকশায় উঠে তিনি চালককে শহীদ মিনারের কাছে একটি ছাতিমগাছের নিচে থামতে বলেন। গাছটি স্থানীয়ভাবে শয়তানগাছ নামেও পরিচিত। ফুলার রোডের ভাস্কর্যগুলো পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেলেও লেখকের মনে ঘুরপাক খেতে থাকে মাজনুর প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি ফিরে তাকান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অস্বস্তিকর সত্য এবং সেই সত্যের জায়গায় নিজেদের সুবিধামতো তৈরি করা বয়ানের দিকে।
একটি ভাস্কর্য কখনোই নিছক পাথর, ধাতু কিংবা কংক্রিটের অবয়ব নয়। এর মধ্য দিয়ে একজন মানুষের জীবনকে ছাড়িয়ে কোনো স্মৃতি, আদর্শ, সংগ্রাম কিংবা সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষাকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। একটি সমাজ কাদের স্মরণ করতে চায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কোন ইতিহাস তুলে ধরতে চায়, তারও প্রতিফলন ঘটে এসব স্মারকে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই স্মৃতিই যখন রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, তখন কী ঘটে?
যেসব মানুষ একসময় স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে তাঁদের অবদান কি হঠাৎ অর্থহীন হয়ে যায়? বর্তমানের কোনো রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে অতীতের কোনো ব্যক্তিত্বের স্মৃতি সাংঘর্ষিক হলেই কি সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করতে হবে?
কোনো ভাস্কর্যের চোখ বেঁধে দেওয়া আপাতদৃষ্টিতে প্রতিবাদ কিংবা রাজনৈতিক ক্ষোভের প্রকাশ হতে পারে। আবার একটি ভাস্কর্যকে অবহেলায় ঘাসের ওপর ফেলে রাখাকে অনেকে সামান্য ঘটনা হিসেবেও দেখতে পারেন। কিন্তু এমন প্রতিটি দৃশ্যের মধ্য দিয়ে আরও বড় কিছু প্রশ্ন সামনে আসে। একটি সমাজের স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করে কারা? জাতীয় পরিচয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণের অধিকার কার? আর কার অবদান ইতিহাসে টিকে থাকবে, সেই সিদ্ধান্তই বা নেবে কে?
এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি স্মারককে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে সমালোচনার বাইরে রাখা উচিত। ইতিহাসের পর্যালোচনা জরুরি। যাঁদের স্মরণ করা হয়, তাঁদের জীবন, কর্মকাণ্ড এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। জনস্মৃতির সঙ্গে যুক্ত ভাস্কর্য ও স্মারক নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে।
কিন্তু ইতিহাসকে সমালোচনার মুখোমুখি করা আর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেই ইতিহাসকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া এক বিষয় নয়।
যে সমাজ নিজের ইতিহাস সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী, অতীতের অসংগতির মুখোমুখি হতে সেই সমাজের স্মারকের চোখ বেঁধে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। একইভাবে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য অতীতের সব স্মৃতি মুছে ফেলাও জরুরি নয়।
ছাতিমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে লেখক আবারও মাজনুর প্রশ্নের কথা ভাবেন। হয়তো রিকশাচালক শুধু কয়েকটি ভাস্কর্যের পরিণতি সম্পর্কে জানতে চাননি। তাঁর প্রশ্নের গভীরে ছিল আরও বড় এক জিজ্ঞাসা। যে সমাজ একসময় এসব মানুষকে সম্মানের আসনে বসিয়েছিল, সেই সমাজই এখন তাঁদের স্মৃতি নিয়ে কী করবে, তা নির্ধারণ করতে পারছে না কেন?
ফুলার রোডের ভাস্কর্যগুলোর বর্তমান অবস্থা তাই শুধু কয়েকটি অবয়বের চোখ বাঁধা কিংবা ঘাসের ওপর পড়ে থাকার গল্প নয়। এর মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে সমাজের উদ্বেগ, বেছে বেছে ইতিহাস মনে রাখার প্রবণতা এবং স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অর্থ নিয়ে অমীমাংসিত বিতর্ক।
ভাস্কর্যগুলো কেন এমন অবস্থায় রয়েছে, তার পেছনের নির্দিষ্ট ঘটনা ও দায় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে এই দৃশ্য আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ তৈরি করে।
হয়তো ভাস্কর্যগুলোকে যন্ত্রণাক্লিষ্ট মনে হওয়ার কারণ শুধু তাদের চোখ বেঁধে দেওয়া কিংবা অবহেলায় ফেলে রাখা নয়। বরং যে সমাজে তারা দাঁড়িয়ে আছে, সেই সমাজ এখনো তাদের প্রতিনিধিত্ব করা আদর্শগুলোর সঙ্গে নিজের বর্তমান বাস্তবতার সমন্বয় ঘটাতে পারেনি।
তাই প্রশ্নটি কেবল এই নয়, ফুলার রোডের ভাস্কর্যগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো, ভাস্কর্যগুলোর এই পরিণতি আমাদের নিজেদের সম্পর্কে কী বলে?
