লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

ঢাকার যানজট আর জনসংখ্যা বাড়ছে, মেট্রোরেল জরুরি — কিন্তু নির্মাণ ব্যয়ের কারণে ভাড়া কি সাধারণ মানুষের নাগালে থাকবে?

প্রকাশিত: 17 সেপ্টেম্বর 2026

51 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

ঢাকার জনসংখ্যা ও পরিবহন চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু শহরের সড়ক অবকাঠামো সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে দীর্ঘ যানজট, বায়ুদূষণ ও যাতায়াতে সময় অপচয় নগরজীবনের বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। এ বাস্তবতায় ঢাকায় নতুন মেট্রোরেল শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ঢাকার বিদ্যমান গণপরিবহন ব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান পরিবহন চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে এবং যানজট আরও তীব্র হচ্ছে। সীমিত জায়গার শহর ঢাকায় একই সড়কপথে বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উচ্চক্ষমতার মেট্রোরেল কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। সংস্থাটির মতে, মেট্রোরেল যানজট ও বায়ুদূষণ কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জাইকার সাম্প্রতিক গবেষণাতেও মেট্রোরেলের প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল চালুর পর সংশ্লিষ্ট করিডোরে যানবাহনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। তবে গবেষণায় একই সঙ্গে বলা হয়েছে, মেট্রোরেল নতুন যাতায়াত চাহিদা তৈরি করায় সময়ের সঙ্গে অতিরিক্ত সড়ক সক্ষমতা আবার চাপে পড়তে পারে। অর্থাৎ একটি বা দুটি লাইন দিয়ে ঢাকার সামগ্রিক পরিবহন সংকট সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত গণপরিবহন নেটওয়ার্ক।

এই বাস্তবতার মধ্যেই তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পে বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এসেছে। হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা, বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত তিনটি পথে পাতাল ও উড়াল মিলিয়ে মোট ৬৪ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিন প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানের ঋণে দুটি প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দুই লাখ চার হাজার কোটি টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে অন্য প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

এখানেই বড় প্রশ্ন—ঢাকার জন্য মেট্রোরেল প্রয়োজন হলেও এত ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কতটা টেকসই হবে?

উত্তরা-মতিঝিল পথে বর্তমানে সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা এবং পুরো ২০ কিলোমিটার যাত্রায় ভাড়া ৯০ টাকা। একই দূরত্বে সরকার নির্ধারিত বাসভাড়া ৫০ টাকা এবং বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। মেট্রোরেল উন্নত, দ্রুত ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হলেও ভাড়া সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মেট্রোরেল আইনে জনসাধারণকে স্বল্প ব্যয়ে উন্নত ও দ্রুত গণপরিবহনসেবা দেওয়ার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় ও মানুষের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

ব্যয়ের তুলনাটিও উদ্বেগ তৈরি করছে। তিন প্রকল্পে গড়ে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ও ট্রেন চালুর ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। বিপরীতে ভারতে জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা বলে ডিএমটিসিএলের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। উত্তরা-মতিঝিল পথে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা।

এখন পর্যন্ত উত্তরা-মতিঝিল পথে টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে মোট প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা। এর বাইরে দোকানভাড়া ও বিজ্ঞাপনসহ অন্যান্য খাত থেকে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা আয় হয়। অথচ শুধু বেতন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন খাতে গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ১০০ কোটি টাকার বেশি। রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রপাতির ব্যয়ও এখন থেকে ডিএমটিসিএলকে নিজস্বভাবে বহন করতে হবে।

উত্তরা-মতিঝিল পথে জাইকার কাছ থেকে নেওয়া প্রায় ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা ঋণ ৩০ বছরে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। চলতি বছরে কিস্তি দিতে হবে প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা এবং ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত কিস্তির পরিমাণ ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি। বর্তমান আয় দিয়ে এই কিস্তি পরিশোধ সম্ভব নয়। নতুন দুটি জাইকা-অর্থায়িত প্রকল্পে আরও প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা এবং অন্য প্রকল্পে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা রয়েছে।

ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে ঋণের শর্ত ও দরপত্র ব্যবস্থার প্রতিযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জাইকার ঋণের শর্তে জাপানি ঠিকাদার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা, দরপত্র প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়েও তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিছু কারিগরি শর্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সীমিত করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবু ঢাকার জন্য নতুন মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মূল প্রশ্নটি আলাদা। বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে তীব্র যানজট ও অপর্যাপ্ত গণপরিবহনকে চিহ্নিত করে আসছে। জাইকার গবেষণাও দেখাচ্ছে, উচ্চক্ষমতার নগর রেল যোগাযোগব্যবস্থা যান চলাচল ও বায়ুদূষণের চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অতএব প্রশ্নটি শুধু মেট্রোরেল হবে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—ঢাকার ক্রমবর্ধমান পরিবহন চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় মেট্রোরেল কীভাবে কম ব্যয়ে, স্বচ্ছ প্রতিযোগিতায়, মানুষের সাধ্যের মধ্যে ভাড়া রেখে এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণের বোঝা সামলানোর মতো আর্থিক কাঠামোয় নির্মাণ করা যায়। কারণ ঢাকার যানজট কমাতে নতুন উচ্চক্ষমতার গণপরিবহন প্রয়োজন, কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটাতে নেওয়া ঋণ ও ব্যয়ের বোঝা যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি না করে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকও মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে বর্তমান ব্যয়কে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে লাভজনক পথেও ব্যয় তুলে আনা যাচ্ছে না। জাপানি ঋণ, জাপানি ঠিকাদার, জাপানি প্রযুক্তি ও ইয়েনে ঋণ নেওয়ার বিপরীতে ডলারে পরিশোধের কাঠামো প্রকল্প ব্যয়কে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

সুতরাং ঢাকার জন্য নতুন মেট্রোরেল প্রয়োজন—এ নিয়ে প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এর অর্থনৈতিক কাঠামো। যানজটমুক্ত, বাসযোগ্য ও উৎপাদনশীল ঢাকা গড়তে মেট্রোরেল দরকার; তবে সেই মেট্রোরেলকে একই সঙ্গে সাশ্রয়ী, দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও আর্থিকভাবে টেকসই করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman

taraftarium24canlı maç izleselcuksportstaraftarium24canlı maç izletaraftarium24canlı maç izletaraftarium24canlı maç izletaraftarium24canlı maç izlecanlı maçtaraftarium24canlı maç izlemaç izletaraftarium24canlı maç izlemaç izle