দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, সরকারি নির্দেশ অমান্য এবং অসদাচরণের অভিযোগে পুলিশের ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। একই সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে পুলিশের আরেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার ও গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর স্বাক্ষরে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া, সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া ছয় কর্মকর্তা হলেন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক শ্যামল কুমার মুখার্জি, সাবেক উপমহাপরিদর্শক মো. আনিসুর রহমান, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার ফারহানা তাসকিন ও মো. মনিরুজ্জামান সরকার এবং সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান। তাঁদের সঙ্গে সাবেক ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদও রয়েছেন। অন্যদিকে, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার কাজী মিজানুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত হারুন
মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও পরিচালন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তাঁর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং ই-মেইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কর্মস্থলে ফেরেননি। এ ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরের উদ্যোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি লিখিত জবাব দেননি। তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের পর তদন্তে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি।
পরে সরকারি কর্ম কমিশনের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুদণ্ড আরোপের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। কমিশন ১ অক্টোবর তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তের পক্ষে মতামত দেয়। রাষ্ট্রপতি ২৫ অক্টোবর এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। তাঁর বরখাস্তের আদেশ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কার্যকর করা হয়েছে।
ছুটি ও নির্দেশ অমান্য করায় শাস্তি
সাবেক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক শ্যামল কুমার মুখার্জি সর্বশেষ পর্যটন পুলিশে কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি তাঁকে রাজশাহীতে উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ২২ জানুয়ারি সেখানে যোগদানের পর তিনি তিন সপ্তাহের বিশ্রামের কথা উল্লেখ করে প্রস্থান প্রতিবেদন জমা দেন। তবে নির্ধারিত সময় শেষে আর কর্মস্থলে যোগ দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
সাবেক উপমহাপরিদর্শক মো. আনিসুর রহমান ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট নৌপুলিশে সংযুক্ত হয়ে যোগদান করেছিলেন। পরে অসুস্থতার কথা জানিয়ে প্রতিবেদন জমা দিলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ছুটির ধরন ও মেয়াদসংক্রান্ত তথ্য দেননি। একাধিকবার নোটিশ পাঠানোর পরও কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তাঁর বরখাস্তের আদেশ ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর করা হয়েছে।
নৌপুলিশের টাঙ্গাইল অঞ্চলে কর্মরত সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর কর্মস্থল ত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে আরও ৬০ দিনের ছুটি বৃদ্ধির আবেদন নাকচ হলেও তিনি কাজে যোগ দেননি। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রে আদেশ কার্যকর হয়েছে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে।
বিদেশে থেকে কর্মস্থলে ফেরেননি দুই কর্মকর্তা
সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার ফারহানা তাসকিন ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ৪২ দিনের ছুটি নিয়ে কানাডায় যান। পরে অসুস্থতার কথা জানিয়ে আরও ৩৬ দিনের ছুটি বৃদ্ধির আবেদন করেন। এরপর কানাডার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন বছর মেয়াদি হিসাববিষয়ক পেশাগত কোর্সে পড়ার জন্য শিক্ষা ছুটির আবেদন করেন। তবে মন্ত্রণালয় তাঁর আবেদন নাকচ করে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তিনি আর দেশে ফেরেননি।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ ছুটি শেষ হওয়ার পরও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবও না দেওয়ায় তাঁকে ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ থেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার যুক্তরাজ্যের কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে ২০১২ সালে প্রেষণে যান। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় তাঁর বিনা বেতনে ছুটি বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছুটি বাড়ানোর আবেদন নাকচ করে তাঁকে দেশে ফিরে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি ফেরেননি।
এ ঘটনায় ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকেও ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
অসদাচরণের অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসর
সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার কাজী মিজানুর রহমানকে বরখাস্ত না করে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তিনি অপরাধ তদন্ত বিভাগে দিনাজপুর জেলায় কর্মরত ছিলেন। এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও ট্রাফিক অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেন।
বিভাগীয় তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এতে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির ২৫ অক্টোবরের অনুমোদনের পর তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর আদেশ জারি করা হয়।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো। তবে বিভিন্ন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বরখাস্তের আদেশ ভিন্ন ভিন্ন তারিখ থেকে কার্যকর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের কার্যকর তারিখগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
