প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় এক সময় এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান ছিলো ঈর্ষা করার মতো। সুস্থ প্রতিযোগিতার নমুনা দেখা যেতো সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে। বোধ করি, ৮০ এবং ৯০ দশক হয়ে শিক্ষার এই সংস্কৃতি বিরাজ করেছিল ২০০৮/৯ পর্যন্ত। যারা এসব পর্যায়ে ভালো করতো তারা এখনো দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে দায়িত্বের সাথে।
সময়ের পরিক্রমায় সরকার বদল হয়েছে, যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছিল তারা ব্যক্তিগত অসদুদ্দেশ্য চরিতার্থ ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের জন্য প্রশাসনকে ব্যবহার করলেও কখনো দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেনি। এটা ঠিক যে, অনেক ক্ষেত্রেই তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতির প্রসারন ঘটিয়েছে, যোগ্যদের চাকরির ক্ষেত্রে বঞ্চিত করেছে কিন্তু পাঠ্যক্রম নষ্ট করেনি।
এখানে ২০০১ সালের জোট সরকারের কথা বলা যেতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হবার পর জনাব এহসানুল হক মিলন ‘নকলের বিরুদ্ধে জিহাদ’ ঘোষণা করেছিলেন। উঁচু মানের সিলেবাস, সেই অনুসারে তথ্যবহুল পাঠ্য বই, মান সম্মত শিক্ষক – শিক্ষিকা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, সঠিক ও সমোপযোগী পরীক্ষা পদ্ধতি প্রণয়ন দেশের শিক্ষার মানকে নিয়ে গিয়েছিলো অন্য এক অনন্য উচ্চতায়। আবারো বলছি, যোগ্য ছাত্র – ছাত্রী অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হলেও শিক্ষার মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিলো না।
ক্ষমতার পালা বদলে বাংলাদেশ তার ইতিহাসের নির্মম সময়ে উপনীত হয়েছিল বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে। পাঠ্য বইগুলো যেনো হঠাৎ করেই বদলে গিয়েছিলো। পাঠ্যপুস্তকগুলো যেনো পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক প্রোপাগাণ্ডা কিতাবে। বিশেষ এক ব্যক্তি, একটি দল ও তার পরিবারকে বার বার হাইলাইট করা হয়েছে এবং তাদের ব্যক্তিগত তথ্য মুখস্ত করানো হয়েছে, মহান মুক্তিযুদ্ধকে এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক একটি ঘটনা হিসেবে বারবার উপস্থাপন করে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা লড়াকু মুক্তিযোদ্ধাদের খাটো করা হয়েছে। বিতর্কিত বিষয় (যেমনঃ সমকামিতা) পাঠ্যপুস্তকে যোগ করে বিভ্রান্তির সৃষ্টি বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এই সবই যেনো কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঘটে চলেছিল।
আমাদের সত্যিকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিজ্ঞানের খুব সাধারণ বিষয়, সর্বোপরি, ধর্মীয় নীতি ও আদর্শ যেনো বইগুলো থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিলো অন্তঃসার শূন্য জ্ঞানহীন এক পঙ্গু জাতি গড়ার উদ্দেশ্যে।
অন্তঃসারশূন্য বইগুলো আর খুব মানহীন পরীক্ষা পদ্ধতি অনেক মেধাবীদের অকাল মৃত্যু ঘটিয়েছে। তথকথিত ‘জিপিএ ৫’ কিংবা ‘গোল্ডেন জিপিএ’ যেনো জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
এর ফলশ্রুতি আমরা দেখেছি, শুধু মুখস্ত পড়াশুনা যা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি না বাড়িয়ে বরং আরো সংকুচিত করেছে। সুশিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি আত্মসম্মান নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেনা, এটি প্রমাণিত সত্য। সঠিক ও মানসম্মত শিক্ষা এ কারণেই প্রয়োজন যেন একটি জাতী তার স্বকীয়তা বজায় রেখে যথেষ্ঠ চিন্তাশীল হয়ে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে, এই যোগ্যতাই একটি জাতিকে অন্যের ক্রীড়ানক হওয়া থেকে দিতে পারে সুরক্ষা। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে এবং নিজের জাতির মাথা উঁচু রাখতে সুশিক্ষার কোনো বিকল্প হতে পারে না। প্রত্যাশা থাকবে ভবিষতের সরকারগুলো এই ব্যাপারে মনোযোগী ও যত্নশীল হবেন।

লেখক –
মোঃ আকতার হোসেন (রুমী)
আইনজীবী, শ্রম আইন বিষয়ক।
