দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠা গণআন্দোলন রুখতে কঠোর দমনপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। ইমরান খানের রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারির পর থেকেই বিরোধী দলের ওপর সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে প্রশাসন। বার্তা সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর থেকে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) অন্তত ২৭৮ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। একই সাথে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে কার্যত অকার্যকর করে পুরো প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে ইসলামাবাদ।
অবরুদ্ধ খাইবার পাখতুনখোয়া ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা
কঠোর অর্থনৈতিক সংকট এবং কারাবন্দি নেতা ইমরান খানের ওপর প্রশাসনিক বিধি-নিষেধের প্রতিবাদে কয়েক দিন ধরেই উত্তাল ছিল খাইবার পাখতুনখোয়া। হাজার হাজার সমর্থক প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে রাজধানী ইসলামাবাদের দিকে পদযাত্রার ঘোষণা দেন। এই গণজোয়ার ঠেকাতে রোববার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্সি থেকে বিতর্কিত সাংবিধানিক পদক্ষেপ হিসেবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার জানান, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়ন না হওয়া পর্যন্ত পিটিআই নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না।

জরুরি অবস্থা জারির পর প্রথম দিনেই প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারকে কার্যত একটি অবরুদ্ধ নগরীতে রূপান্তর করা হয়। ঐতিহাসিক হাশতনাগরি গেটসহ শহরের প্রশাসনিক অঞ্চলের প্রবেশপথগুলোতে বিশাল আকৃতির শিপিং কনটেইনার ও কাঁটাতারের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। প্রতিটি চেকপয়েন্টে মোতায়েন করা হয়েছে দাঙ্গা প্রতিরোধী পুলিশ। সোমবার প্রদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। ইন্টারনেট নজরদারি সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, রবিবার রাত থেকেই প্রদেশের বহু এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
প্রশাসনের এমন পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দারা এটিকে “উপনিবেশিক কায়দায় চাপিয়ে দেওয়া শাসন” বলে অভিহিত করেছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি আটক, পিটিআইর তীব্র প্রতিবাদ
জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পিটিআই একে সরাসরি গ্রেপ্তার দাবি করলেও কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার নয় বরং “হেফাজতে” নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, মুখ্যমন্ত্রীকে প্রথমে তাঁর সরকারি বাসভবনে ‘সুরক্ষামূলক হেফাজতে’ রাখা হলেও পরে অজ্ঞাত কোনো স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

এদিকে ইসলামাবাদে আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে বলেন, “এই পরিবর্তনের মাধ্যমে খাইবার পাখতুনখোয়ার মানুষ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি পাবে। আমরা কেবল পাকিস্তান নয়, পুরো অঞ্চল থেকেই সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করে মানুষের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চাই।”
তবে কেন্দ্রীয় সরকারের এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে পিটিআই। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং জনগণের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অবৈধ ক্ষমতা দখলের নির্লজ্জ চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
দমনপীড়নের মুখেও রাজপথে সমর্থকরা
প্রশাসনের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ ও ব্যাপক ধরপাকড়ের মুখে সোমবার বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি কিছুটা সীমিত হলেও বিভিন্ন অঞ্চলে ইমরান খানের সমর্থনে স্লোগান অব্যাহত থাকে। খাইবার জেলার বারা শহরে বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং অন্তত পাঁচজনকে আটক করে। পেশোয়ারের রাজপথেও পুলিশি ব্যারিকেড উপেক্ষা করে পিটিআই সমর্থকরা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে স্লোগান তোলেন।

জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারান্তরীণ রয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা নানাবিধ অভিযোগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ, যা তিনি ও তাঁর আইনজীবীরা শুরু থেকেই দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কারাগারে তাঁর নিজস্ব চিকিৎসকদের প্রবেশের সুযোগ না দেওয়া এবং রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করার প্রতিবাদেই উত্তাল হয়ে ওঠে পাকিস্তান। চরম প্রশাসনিক চাপ ও জরুরি অবস্থার মধ্যেও ইমরান খানের প্রতি জনসমর্থন কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকছে।
