দ্য সিভিলিয়ানস । আন্তর্জাতিক ডেস্ক ।
ভারত বর্তমানে এমন এক সময় পার করছে, যাকে অনেক বিশ্লেষক দেশটির ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় নীতি, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশটি ক্রমেই ধর্মীয় বিভাজনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংখ্যালঘুদের জন্য ভারত এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনিরাপদ।
বিবিসি, রয়টার্স ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য, সামাজিক বয়কট, মব লিঞ্চিং ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০১৪ সালের পর থেকে গরু জবাই, আন্তধর্মীয় বিয়ে, পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসকে কেন্দ্র করে বহু সহিংস ঘটনার নথিভুক্ত তথ্য রয়েছে।
সম্প্রতি বিহারে এক সরকারি অনুষ্ঠানে একজন মুসলিম নারী মেডিকেল শিক্ষার্থীর হিজাব খুলে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার একটি সরকারি অনুষ্ঠানে একজন মুসলিম মহিলা ডাক্তার নুসরাত পারভীনের হিজাব (নিকাব) টেনে খুলে দেন, যখন তিনি তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার গ্রহণ করছিলেন। এই ঘটনা ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ঘটে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এটিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে নিন্দা করে, উল্লেখ করে যে এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নারীর অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে। ঘটনার পর মহিলাটি তার চাকরিতে যোগ দেননি, এবং রাজনৈতিক বিতর্ক উঠেছে, যেখানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিংয়ের মতো ব্যক্তিরা বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এ
মাত্র কয়েক দিন আগে ত্রিপুরার ২৪ বছর বয়সী এমবিএ ছাত্র অ্যাঞ্জেল চাকমা উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে ছুরিকাঘাতে নিহত হন। ঘটনাটি ৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ঘটে, যখন তাকে এবং তার ভাইকে ‘চাইনিজ’ বলে রেসিস্ট গালাগালি দেওয়া হয় এবং আক্রমণ করা হয়। ১৭ দিন হাসপাতালে থাকার পর ২৫ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। পুলিশের মতে, এটি রেসিয়াল ভায়োলেন্স নয় বরং একটি ব্যক্তিগত তর্ক, এবং অভিযুক্তরা মণিপুরি যুবক। তবে চাকমার পরিবার এবং ত্রিপুরায় প্রতিবাদকারীরা এটিকে রেসিয়াল হেট ক্রাইম বলে দাবি করছে, যা উত্তর-পূর্ব ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বৈষম্যের প্রতিফলন।
২০২৫ সালের ক্রিসমাসে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিস্টানদের উপর আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। ছত্তিশগড়ের কানকার গ্রামে ১৭ ডিসেম্বর হিন্দু এক্সট্রিমিস্টরা দুটি চার্চ পুড়িয়ে দেয় এবং খ্রিস্টানদের বাড়ি ধ্বংস করে। জয়পুরে সেপ্টেম্বরে একটি চার্চে হামলা হয়, যেখানে হিন্দু ন্যাশনালিস্টরা চেয়ার ছুড়ে মারে এবং পুরোহিতদের অভিযুক্ত করে। ছত্তিশগড়ে একটি মলে ক্রিসমাস ডেকোরেশন ভাঙচুর করা হয়, স্লোগান দিয়ে। ওড়িশা এবং অন্যান্য রাজ্যে অনুরূপ ঘটনা ঘটে, যা ওপেন ডোরস এবং দ্য টেলিগ্রাফ দ্বারা রিপোর্ট করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলোকে ২০২৫ ক্রিসমাস ভায়োলেন্স হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার পিছনে অ্যান্টি-খ্রিস্টান সেন্টিমেন্ট এবং হিন্দু ক্সট্রিমিজম আইডিওলজি কাজ করছে।
সাম্প্রতিক আরো অন্যান্য সাম্প্রতিক ঘটনা, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাদ্ধমে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। ত্রিপুরায় ডিসেম্বরে একটি মুসলিম ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হিন্দু এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ হামলা হয়। লখনৌতে ক্রিসমাস উদযাপনে হিন্দু স্লোগান দিয়ে বাধা দেওয়া হয়। পোস্টস অনুসারে, বিহারে একজন মুসলিম পুরুষকে পাবলিকলি মারধর করা হয় ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য করা হয়, যা হিন্দুত্ব আইডিয়োলজির সাথে যুক্ত।
২০২৫ সালের শেষের দিকে কর্নাটকায় একটি অনার কিলিংয়ের ঘটনায় দলিত (নিন্ম বর্ন হিন্দু) সংগঠনগুলো অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছে। এই ঘটনাকে কাস্ট-ভিত্তিক সহিংসতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা মানবতার উপর আক্রমণ। উত্তর প্রদেশের একটি গ্রামে এক দলিত যুবককে লিঞ্চ করে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারটি প্রথমে গ্রাম ছাড়েনি, কিন্তু পরবর্তীতে ভয়ে পালাতে বাধ্য হয়। মহারাষ্ট্রের নান্দেড়ে এক দলিত যুবককে কাস্ট-ক্রসিং প্রেমের জন্য হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনা দলিতদের প্রতি সংখ্যাগুরু সমাজের অবহেলা প্রকাশ করে।
সবচেয়ে হতাশার ব্যাপার হলো এতো বড় বড় অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রটির উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় নি, বরং রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দলের কর্তা ব্যাক্তিদের অনেকেই প্রকারান্তরে উগ্রতাকে আরো উস্কে দিচ্ছেন বলে সাধারণের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও মুসলিমদের মসজিদ ও বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া ভারতীয় উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নিত্তনৈমিত্তি কাজ।
বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো কেবলই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সংখ্যালঘুদের ‘অন্য’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি রাজনৈতিক বয়ান ধীরে ধীরে সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। এতে করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
প্রশ্ন উঠছে, ভারতে কি ভিন্ন ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের পরিচয় নিয়ে নিরাপদে বাঁচতে পারবে? মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে রাষ্ট্র ও সমাজ কত দ্রুত ঘৃণার রাজনীতি থেকে সরে এসে সংবিধানিক মূল্যবোধে ফিরে যেতে পারে তার ওপর।
