দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোরবানির পশু প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে পশুখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বাড়তি উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে ক্রেতা সংকটের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন খামারিরা। বিশেষ করে মাঝারি আকারের গরুর বাজার নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীর কোরবানির হাটে বিপুল সংখ্যক পশু সরবরাহ হয়। কিন্তু খামারিদের অভিযোগ, এবার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও সেই তুলনায় বাজারদর বাড়েনি। ফলে লাভের পরিবর্তে লোকসানের শঙ্কা বাড়ছে।
জয়পুরহাট ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাদমান জয় রায়হান বলেন, খামার পরিচালনায় বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও পশুখাদ্যের খরচ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। খামারের বিদ্যুৎকে এখনো কৃষিখাতের আওতায় না আনার কারণে খামারিরা বাড়তি চাপের মধ্যে রয়েছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে অনেক ছোট ও মাঝারি খামার বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, একটি গরু মোটাতাজা করতে চার থেকে ছয় মাস সময় লাগে। এই সময়ে শুধু খাবারের পেছনেই খরচ হয় প্রায় ৪৭ থেকে ৫৪ হাজার টাকা। এর বাইরে চিকিৎসা, পরিবহন ও শ্রম ব্যয় যোগ হলে খরচ আরও বেড়ে যায়। অথচ বিক্রির সময় প্রত্যাশিত দাম না পেলে লাভের পরিমাণ খুবই কমে যায়।
জয়পুরহাটের খামারি রোজিনা পারভিন জানান, কয়েক বছর লাভে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে টানা লোকসানের কারণে তাকে খামার বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, “এত খরচ করে গরু পালন করে শেষ পর্যন্ত যদি সামান্য লাভ হয়, তাহলে এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন।”
পাবনার বেড়া উপজেলাতেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা গেছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ৪০ হাজার হলেও প্রস্তুত রয়েছে ৯২ হাজারের বেশি পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ বেশি হয়ে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন খামারিরা।
চরাঞ্চলের কয়েকজন খামারি জানান, গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার লাভ করা কঠিন হবে। অনেকের আশঙ্কা, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ করলে স্থানীয় বাজারে বড় ধস নামতে পারে। যদিও প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং অবৈধ পশু প্রবেশ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে এবার কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই। বরং অধিকাংশ জেলায় স্থানীয় চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। সাতক্ষীরা, শেরপুর ও ভৈরবসহ বিভিন্ন এলাকায় উদ্বৃত্ত পশু রাজধানীসহ বড় বাজারগুলোতে সরবরাহ করা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ডেইরি ও গবাদিপশু খাত এখন গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব খামারিদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই খাত টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ এবং খাদ্য ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি জরুরি।
